রনডিয়ায় সূর্যাস্ত

0
117

sambhu

শম্ভু সেন

ছল ছল করে গ্রাম….

না, চূর্ণী নদী তীরে নয়, এ নদী সেই নদী ‘বৈশাখ মাসে যার হাঁটুজল থাকে….’।

বিজ্ঞাপণ

আর ভরা বর্ষায় ?

এ-কুল ও-কুল দু’কুল ভেসে যায়। না, হৃদয়ের নয়, এই নদীর। ঠিক এই ভাবে অবশ্য বলেননি তিনি। চায়ের গেলাসে চামচ দিয়ে চিনি নাড়তে নাড়তে ‘বাংলার দুঃখের’ গল্প শুনিয়েছিলেন তিনি। মাঝবয়সি মানুষটি অবশ্য এ সবই শুনেছেন তাঁর বাপ-ঠাকুরদার কাছে। বলছিলেন, “বুঝলেন না, দামোদর বলে কথা। বর্ষায় কি আর সে এমন শান্তশিষ্ট থাকতে পারে ? যতই ডিভিসি হোক, আর যা-ই হোক, বর্ষায় দু’কুল ছাপিয়ে যায়। আর ডিভিসি জল ছাড়লে তো কথাই নেই”।

গরমের তাপটা যেন একটু গা-সওয়া এখন। অ্যান্ডারসন উইয়্যারের পাশে এই একটি মাত্র চায়ের দোকান। সবে উনুনে আঁচ পড়েছে, ঝাঁপ খুলেছে একটু আগে, রোদ পড়ো পড়ো। দামোদর গা এলিয়ে পড়ে আছে, বেশিটাই বালি, মাঝে মাঝে পা-ছোপানো জল। ও-পার কিন্তু বেশ ঝাপসা।

“আগে শীতের দিনে এখানে বেশ ভিড় হত। পিকনিক পার্টির ভিড়। এখন আর তেমন হয় না। আর গরমে তো দেখছেন। টুরিস্ট কোথায় ? লোকাল লোকজন তো বাজারেই চায়ের পাট সেরে নেয়। যাঁরা নদী পেরিয়ে ও-পারে যান তাঁরাই এখানে একটু জিরোন, একটু-আধটু চা খান। আর রাস্তার অবস্থা দেখেছেন তো। টুরিস্ট আসবে কেন ?” মানুষটির কথায় কিছুটা যেন ক্ষোভ ঝরে পড়ে।

চায়ের সঙ্গে আমাদের মিক্সড চাটও চলছে। মিক্সড চাট মানে ডালমুটে শসা, পেঁয়াজ, টমেটো, আদা-লঙ্কার কুচি মেশানো।

শেষ দুপুরে এসে পৌঁছেছি এই রনডিয়ায়। পানাগড় বাজার থেকে বাঁ দিকের পথ। রেলগেট পেরিয়ে স্টেশন ছাড়িয়ে পথ চলল পানাগড় ক্যান্টনমেন্ট এলাকার গা দিয়ে। ১০ কিলোমিটার। বাজারে এসে পিচের রাস্তা শেষ। এর পর লাল মাটির রাস্তা। এগিয়ে গেছে নদীর দিকে। খোলা মাঠটাকে গোল করে ঘুরে সোজা উঠে গেছে বাঁধের ওপর। নদীবাঁধ, যার পোশাকি নাম অ্যান্ডারসন উইয়্যার। লাল মাটির রাস্তা শেষ। সামনে পায়ে হাঁটা পথ। ডান দিকে দামোদর, বাঁ দিকে বেরিয়ে গেছে নদীর ক্যানাল। ক্যানালের দু’পাড়ে হরেক রকম গাছ। বেশ একটা জঙ্গল জঙ্গল ভাব।

“কত সাহেবসুবো এসেছিল। সে এলাহি ব্যাপার”, ঠাকুরদার মুখে শোনা ৮০ বছর আগেকার সেই দিনটার কথা চা-দোকানি এমন করে গল্প করে শোনাচ্ছিলেন, যেন তাঁর নিজের দেখা।

randiha-1

‘বাংলার দুঃখ’কে নিয়ন্ত্রণ করার কথা চিন্তা করেছিল তখনকার বেঙ্গল গভর্নমেন্ট। আর তার জন্য বেছে নেওয়া হল এই রনডিয়াকে। শুরু হল বাঁধ তৈরির কাজ। ছ’ বছর পর, ১৯৩৩-এর ২ এপ্রিল বাংলার গভর্নর স্যার জন অ্যান্ডারসন তাঁর নামে নামাঙ্কিত এই বাঁধটির উদ্বোধন করেন। মার্বেল পাথরের সেই উদ্বোধনী ফলক আজও অক্ষত। বাঁধ তৈরি করেছিল চুনারের তুলসী অ্যান্ড কোম্পানি। যে ইঞ্জিনিয়াররা এই কর্মকাণ্ডের কারিগর ছিলেন তাঁদের সকলেরই নাম আজও জ্বলজ্বল করছে ওই ফলকে।

ধীরে ধীরে ‘ছায়া ঘনাইছে …’। গাছে গাছে। বায়ুদূষণ নেই, শব্দদূষণ নেই, দৃশ্যদূষণ নেই। প্রাণভরে প্রচুর অক্সিজেন নিলাম। নদীর গেরুয়ায়, গাছের সবুজে, আকাশের নীলে ডুব দিলাম। দামোদরের ওপর দিয়ে বয়ে এল প্রাণজুড়োনো বাতাস। মন ভরে গ্রহণ করলাম। জীবন নিস্তরঙ্গ, অচঞ্চল এখানে। ছোটাছুটি নেই, তাড়াহুড়ো নেই। ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়….। কেমন একটা ভালো লাগায় মন ভরে গেল।

“বাবু, নৌকা চড়বেন নাকি ?” আচমকা প্রশ্নে চটকা ভেঙে গেল।

নদীর পাড় ক্রমশ ঢালু হয়ে যেখানে নদীর সঙ্গে মিতালি করেছে, সেখানে নৌকা ভেড়াল সাধন বাগদি। পাটা ফেলে নৌকা ও ঘাটের সঙ্গে সেতু গড়ল। ধরে থাকল লগিটা। আমরা, শহুরে বাবু-বিবিরা, সাবধানী পা ফেলে নৌকা চড়লাম।

সাধনের বাড়ি এই রনডিয়াতেই। গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে সে তার পৈতৃক ভিটেটাও চিনিয়ে দিল। ভরা বর্ষায় যাত্রী পারাপার করে। আর শীতের সময় টুরিস্টদের নৌকাবিহার করায়। ইদানীং সেই টুরিস্ট-স্রোতে ভাটার টান। আর এখন এই গরমে রোজগারপাতি কোথায় ?

সাধন জানিয়ে দিল, খুশি হয়ে যা দেব তাতেই সে খুশি হবে।

বেশ কিছুক্ষণ ভেসেছিলাম দামোদরের বুকে। রোদ উধাও। সূর্যটা এখন ঠিক গোল সোনালি থালা। নদী থেকে মাত্র কয়েক হাত ওপরে। তার সোনালি আলো গলে গলে মিশে যাচ্ছে নদীর জলে। আকাশে সিঁদুর রঙের হাতছানি। আবছা হয়ে আসা ও-পারে তাকিয়ে থাকতে থাকতে লাল টুকটুকে সূর্যটা ডুব দিল দামোদরের বুকে।

কী ভাবে যাবেন

পূর্ব রেলের হাওড়া-আসানসোল শাখায় পানাগড়। হাওড়া থেকে তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ। স্টেশন থেকে বাস মিলবে রনডিয়ার। স্টেশন থেকে অটোও মিলতে পারে। দরাদরি করে নেওয়া ভালো। কলকাতা, হাওড়া থেকে বাসও যায় পানাগড়। আর গাড়িতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে পানাগড়। পানাগড় বাজার থেকে পথ রনডিয়ার।

কোথায় থাকবেন

রনডিয়ায় থাকার দরকার হয় না। তবু বর্ধমান, দুর্গাপুরে থেকে ঘুরে নেওয়া যায় রনডিয়া। বর্ধমান, দুর্গাপুরে থাকার মতো অনেক বেসরকারি হোটেল-লজ আছে।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here