সঞ্জয় চক্রবর্তী

রাঢ় বাংলা যে সময়টা লাল হয় পলাশে, প্রায় একই সময়ে রডোডেনড্রনে লাল হয় সিকিম। মজার ব্যাপার এটাও সিকিমের পশ্চিম প্রান্ত। মোটরচালিত রাস্তার শেষ…শুরু হয় প্রকৃতির ম্যাজিক। দেখতে হলে হাঁটো। আর এই হাঁটা নিয়েই ছিল আমাদের পেট-গুড়গুড়। তা শেষ পর্যন্ত শুক্রবার সন্ধে, উঠে পড়া হল উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসে। গন্তব্য ওখরে।

ট্রেন থেকে নামলাম নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। শাটল জিপ ধরে জোরথাং…হালকা খাওয়া দাওয়া…আরও একটা শাটল ধরে ওখরে। সব মিলিয়ে ঘণ্টা পাঁচ। ভাড়া প্রথমটায় ২০০, পরেরটায় ১০০ টাকা।।

আজ শনিবার। দুপুর দুপুর চলে এসেছি ওখরে। থাকব মাস্টারজির অতিথি হয়ে। শেরপা লজে। শহুরে লোকদের জন্য সমস্ত আধুনিক ব্যবস্থা লজে মজুত। ওখরেতে মোটামুটি তিন ধরনের ভিড় থাকে। ট্রেকার, বার্ড ওয়াচার আর আমাদের মতন একদল, যারা যাবে বার্সে, রডোডেনড্রন দেখতে। তবে এ সব কিছু না করেই, জানলা দিয়ে মেঘ কুয়াশার কাটাকুটি দেখেই দু’দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়। মাঝ ফেব্রুয়ারিতে লোকাল ফেস্টিভ্যাল হয়।

সে যা-ই হোক, পরের দিন সকাল সকাল উঠে পড়লাম। ব্রেকফাস্ট সেরে আমাদের গন্তব্য হিলে। ১১ কিলোমিটার দূরে। গাড়ির রাস্তা শেষ। এসে পড়েছি রডোডেনড্রন স্যাংচুয়ারির গেটে। মাথা পিছু এন্ট্রি ফি ৫৫ টাকা। এর পর শুরু সেই ম্যাজিক রুট। দূরত্ব ৪.৫ কি.মি।। স্যাংচুয়ারিতে একটাই থাকার যায়গা। গুরসকুঞ্জ। হাঁটতে হবে আরও ৫০০ মিটার। ডরমিটরি ও টেন্ট আছে। কারেন্ট নেই। উচ্চতা ১০,৩০০ ফুট। সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জ…আর আমাদের ঘিরে লাল ফুলে ভরা পাহাড়। ফুল দেখার জন্য শুধু সমতল নয়, সিকিমের নানান প্রান্ত থেকে ভিড় জমিয়েছে মানুষ। এক বাঙালি দম্পতি তাঁদের বছর দুয়েকের পুঁচকেটাকে কাঁধে চাপিয়ে, এক বাবা তাঁর অন্ধ পুত্রকে নিয়ে চলে এসেছেন এই শোভা দেখতে। আর এক পরিবার তাঁর বছর চারেকের কন্যাটিকে নিয়ে, টেন্টে গোটা রাত কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছেন সমতলে। এ রকম নানান মানুষের ভিড়ে, গুরসকুঞ্জের সামনে মেলা।

আজ রোববার, সকাল এগারোটা মতন বাজে। আমাদের থাকার কথা আজ এই গুরসকুঞ্জে। ভিড় দেখে ঠিক করলাম চার দিক ঘুরে আমরা ফিরে যাব। রাত কাটাব ওখরেতেই। খাওয়া দাওয়া করে ছবি-টবি তোলা হল। এক আশ্চর্য হাওয়া পুরো বার্সে জুড়ে। নেশা ধরিয়ে দেওয়া লাল ফুলে ভরা গাছগুলোর কনসার্ট যেন। জীবনে প্রথম বার সাদা রডোডেনড্রন দেখে, আমরা চুলটুল ঠিক করে সেলফি তুলতে শুরু করলাম।। সিংগালিলা রেঞ্জ। ভারত ও নেপালের মধ্যকার ন্যাচারাল বর্ডার। ট্রেকাররা এখান থেকেই শুরু করে ফোক্তে-দারা ট্রেক। চার রাত পাঁচ দিনের ট্রেক। রাস্তার দূরত্ব ৪৮ কিমি। পরে গুগুল করে দেখলাম, এই স্যাংচুয়ারি ১০৪ স্কোয়ার কিমি। আর রডোডেনড্রন ভ্যারাইটি প্রায় ৬০০! আছে রেড পান্ডা, ব্ল্যাক বিয়ার। আমরা দেখতে পাইনি।

অনেকটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমরা আপাতত ওখরেতে। কয়েক ঘণ্টায় হেঁটে ফেললাম প্রায় সাড়ে দশ কিমি পথ। রাস্তায় দেখছি ৮ জনের ট্রেকার টিমকে, আর পোর্টারের সংখ্যা ৯! আমাদের দু’দিনের ওখরে-হিলে-বার্সে পর্ব আপাতত শেষ।

পরের দিন ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা ধরলাম শাটল জিপ। যাব সোরেন। এখান থেকে আবার একটা জিপ ধরে রিনচেনপং। ভাড়া দু’টোরই মাথাপিছু ১০০ টাকা করে। পরের দু’দিন ঘুরব উত্রে ভ্যালি, ছায়া তাল, আল্পাইন চিজ ফ্যাক্টরি, আজিংস ওয়াইন ফ্যাক্টরি, হি, বার্মিওক, ডেন্টাম ভ্যালি, কালুক, রিনচেনপং। সব ক’টাই পশ্চিম সিকিমে। রিনচেনপং থেকে কালুক মাত্র ৩ কিমি। হি, বার্মিওক-ও বেশি দূরে নয়। যেখানে খুশি থাকা যেত। আমরা ঠিক করলাম এই দু’ রাত কাটাব রিনচেনপং-এ। বাকিটা ঘুরব গাড়িতে। কারণ, এক বন্ধুর মুখ থেকে শোনা, আকাশ পরিষ্কার থাকলে হোটেলের ব্যালকনি থেকে এভারেস্টও দেখা যায়।

ঘন কুয়াশা থাকায় আমরা অবশ্য কিছুই দেখতে পাইনি। দেখলাম রবীন্দ্রস্মৃতি ভবন, ও পয়জন পোখরি। ইংরেজরা ১৮৬০ সালে সিকিম আক্রমণ করে রিনচেনপং অবধি পৌঁছে যায়। সিকিমের আদিবাসি লেপচারা, এই পুকুরে বিষ মিশিয়ে অর্ধেক ইংরেজ সৈন্য মেরে ফেলে। বাকিরা পালায়। এখন অবশ্য পোখরিতে কোনো জল দেখতে পেলাম না। ও হ্যাঁ, যে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ, ক’দিন কাটিয়েছিলেন, গীতাঞ্জলির কিছুটা লিখেছিলেন বলে শোনা যায়, সেটায় থাকার জন্য ভাড়া পাওয়া যায়। ইন্টারনেটে বুক করতে পারেন। চার দিনের পাহাড় বেড়ানো শেষ…আবার পাড়া বেড়ানো শুরু। আপাতত ট্রেনে বসে ছবি, নিজস্বিগুলো স্ক্রোল করছি, ফেসবুকে আবার ভাট বকতে হবে তো।

টা-টা।

পুনশ্চ: মোবাইলে লিখতে লিখতে কবীর সুমনের ওয়ালে এটা পেলাম…

জার্মানির কোলন শহরে একটা গাড়ির পেছনে সাঁটা স্টিকারে দেখেছিলাম এই কথাগুলো লেখা:

‘সব্বাই চায় প্রকৃতির বুকে ফিরে যেতে। কিন্তু কেউই পায়ে হেঁটে যেতে রাজি নয়’।

এই পুরো ট্রিপটাই কলকাতা থেকে ব্যবস্থা করে দিতে পারে ‘ট্র্যাভেল এন্ড বিয়ন্ড’। ঝক্কি নিতে না চাইলে ফোন করে নেবেন। 9831030702।

আরও পড়ুন: গ্রামের নাম তিংভং

ছবি: লেখক

বিজ্ঞাপন

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here