নার্সিসাস কাঞ্চনঞ্জঙ্ঘা

0
131

debarati_guptaদেবারতি গুপ্ত

ঠান্ডায় ঠান্ডা জায়গায় ঘুরে এলে ঠান্ডা কম লাগে। এ রকম একটা মন-ভোলানো বিশ্বাস নিয়ে ডিসেম্বরের ১০ তারিখ নাগাদ রওনা দিয়েছিলাম দার্জিলিং মেলে এনজেপি’র উদ্দেশে। আসল গন্তব্য পরে বলছি। কুয়াশায় যথারীতি ট্রেন পৌঁছোতে ঘন্টা খানেক লেট করল। তাতে কী! ততক্ষণে অ্যাডভেঞ্চার শুরু হয়ে গেছে মাথার মধ্যে। কাজেই কোনো কিছুতেই দমছে না মন। এনজেপি থেকে গাড়ি নিয়ে যেতে হবে, ঘন্টা চারেকের রাস্তা। এই জার্নিটাও বেড়ে মজার। জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং জেলায় পড়ে, সিকিমে ঢোকা, তার পর সিকিমের মধ্যে দিয়ে খানিক ঘুরে আবার দার্জিলিং জেলার মধ্যে আমাদের মূল গন্তব্য। এমন ঘুরিয়ে নাক দেখানো মার্কা চলনের কারণ হল আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানকার লোকজন দার্জিলিঙে খেয়ে সিকিমের নদীতে গিয়ে আঁচায়। বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে? আচ্ছা, অতটা না হলেও খানিকটা তো বটেই। একদম দার্জিলিং-সিকিম বর্ডার যে!

lingsey

ভনিতা হল অনেক, এ বার জায়গাটার নাম বলি। প্রথমে আমরা গেছিলাম লিংসে বলে একটা ছোট্টো গ্রামে। ললিত পডুয়ালের হোম স্টে ‘গোলসিমল’-এ ছিলাম এক রাত্তির। এই এক মুঠো ছোট্ট গ্রামটায় ট্রেকাররা বেসক্যাম্প করে থাকে নেওড়া ভ্যালি ট্রেক করার আগে। কিন্তু আমরা অলস যাত্রী, ওই সব কঠিন রাস্তায় পা রাখিনি। গেছিলাম আরেক ভূস্বর্গে, তবে সে কথায় আসছি পরে। আগে লিংসে নিয়ে দু’ চার কথা বলে নিই। লিংসে যাওয়ার পথে তিস্তা (বাহনচালক উধভের ভাষায় টিশটা) খানিক সঙ্গ নেবে। গাড়ি করে যেতে যেতে তিস্তার নরম স্বচ্ছ পান্না-সবুজ জলে একবার মুখ দেখে আসতে পারেন। দেখবেন একদম পাহাড়িদের মতো সুন্দর দেখাচ্ছে আপনার মুখটা।

বিজ্ঞাপণ

tista-riverউধভ গাড়িতে ওঠার পর থেকেই ঠান্ডা নিয়ে ভয় দেখাচ্ছিল। কিন্তু লিংসে পৌঁছে ললিতজি আর ভাবির আতিথেয়তায় তেমন ঠান্ডা ঠাওরই হল না। তার ওপর সন্ধে নামতেই বনফায়ার করে গ্রামের সুন্দরী মেয়ে আর উধভের মতোন সুপুরুষ ছেলেদের নাচ-গানে তো দার্জিলিং চায়ের প্যাশন আর কাল কফির গাঢ়ত্ব অনুভব করতে বাধ্য হলাম। তবে চমকে গেলাম ললিতজির বাঁশি শুনে। লিংসে গ্রামে গোলসিমল বলে নাকি এক অচিন পাখির প্রবাদ আছে। সেই পাখি নাকি শুক্ল পক্ষের মাঝরাতে প্রায়ই ডেকে ওঠে কিন্তু তাকে কেউ আজ অবধি দেখতে পায়নি। ললিতজি জানালেন, এখনও অনেক অভিযান বাকি ওঁর গোলসিমলকে খোঁজার জন্য। খুঁজে উনি বের করবেনই। ওঁর বাঁশি শোনার পর মনে হল গোলসিমল ললিতজির কাছে ধরা না দিয়ে যাবে কোথায়! পরদিন সকালে আমাদের রওনা দিতে হবে আরও উত্তরে। কিন্তু তার আগে ডোকশিং ফলস দেখাতে নিয়ে গেলেন ললিতজি। পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে শর্টকাট খুঁজে, ঝুম চাষের খেতখামার পেরিয়ে, এলাচ গাছের পাতা সরিয়ে বেশ খানিকটা নীচে খলবলে ডোকশিং ঝরনা অপেক্ষায় ছিল।

dokshing-falls

মোটামুটি লিংসের পালা শেষ হল। এ বার আরও উত্তরে যেতে হবে। কাঞ্চনজঙ্ঘার আরেকটু কাছাকাছি। উধভ গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেল আমাদের লিংসে থেকে আরও দেড় ঘন্টা দূরে আরেকটা নতুন রূপকথায়। মুলকারখা।

নেওড়া ভ্যালি ট্রেকে ওপরে ওঠার পথে মুলকারখা শেষ ধাপ, যেখানে হোম স্টে পাওয়া যায়। এর ওপরে গেলে তাঁবু খাটিয়ে থাকতে হবে। তবে মুলকারখার পরিচয় শুধুই নেওড়া ভ্যালির বেস ক্যাম্প হিসেবে নয়। এই গ্রামটিতে একটি প্রাকৃতিক লেক আছে। গ্রামবাসীর কথায় মনোকামনা লেক। একমাত্র তালাও যার সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা তার মহারাজকীয় উদাসীনতা হারিয়ে নার্সিসাস হয়ে যায়। সোজা কথায় বললে একমাত্র লেক যার জলে কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিবিম্ব দেখা যায়। তবে অবশ্যই এই অপরূপকে দেখতে হলে ভাগ্য সহায় হতে হবে। মেঘের খামখেয়ালিপনা তো আছেই, সঙ্গে হাওয়া। লেকের জলে যদি কাঁপন লাগে তা হলেও প্রতিবিম্ব ভালো দেখা যায় না।

mulkarkha-lake-reflection-1

আমরা মুলকারখায় উঠলাম লাকপা শেরপার বাড়ি। পৌঁছোনোর পর দিন ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ পূর্ণ চাঁদের আলোয় রওনা দিলাম মনোকামনার উদ্দেশ্যে। গাইড হয়ে চলল লাকপা শেরপার মেয়ে পূর্ণিমা। সূর্যোদয় হওয়ার কথা সাড়ে ৫টা-পৌনে ৬টা নাগাদ। সরকার লেকের দিকে যাওয়ার জন্য নতুন রাস্তা বানাচ্ছে। এখন তার একদম প্রথম ধাপ। পাহাড়ি পাথর ভেঙে গোটা চড়াই-উতরাই-এর পথে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে অ্যাডভেঞ্চার তথা হোঁচটের প্রবণতা দুই-ই বেড়েছে। তবে এবড়োখেবড়োর ঠকাঠকি সামলে যদি এক বার আকাশের দিকে তাকানো যায় আপনার এ যাবদের সব হোঁচটের মলম পেয়ে যাবেন। শুক্ল চতুর্দশীর চাঁদ অস্ত যাচ্ছে কালপুরুষের কোমরবন্ধের পাশ দিয়ে। যাওয়ার সময় আবার কালপুরুষের পুষ্যি লুব্ধকের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে গেল। আকাশের আরেক দিকে সপ্তর্ষিমন্ডল অনুসন্ধিৎসু চোখে তাকিয়ে আছে। প্রথম বার দেখে মনে হল চাঁদের যাওয়ার পথেই তাকিয়ে। তার পর বুঝলাম না, আসলে সে সূর্যের রাস্তা দেখছে। আর মেঘের তাল গোনার চেষ্টায় আছে, খানিকটা আমাদেরই মতো। কারণ মেঘের মতিগতির ওপরই নির্ভর করছে আমাদের ভাগ্য। ঘণ্টা খানেকের চড়াই ভেঙে আমরা পৌঁছোলাম লেকের ধারে। তখন সবে কালো অন্ধকার ফুঁরে ধূসর হতে শুরু হয়েছে। ঠিক ৫টা ৪৫ নাগাদ লাল আভা দেখা গেল আকাশের মধ্যিখানে। কাঞ্চনের চুড়োয়। তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি তাই লেকের জলে আবছা প্রতিচ্ছবি। মিনিট তিন-চারের মধ্যে সাদা হতে শুরু করল চুড়ো। আর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা। আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। এক কুচি মেঘ নেই। নীলের বুকে যেটুকু সাদা সবটাই কাঞ্চনজঙ্ঘা। কিন্তু আসল ম্যাজিক তখনও বাকি। সূর্যের আলো যখন সোজা চূড়ার ওপর পড়ল এক নতুন সোনালি রঙের জাদু-বাস্তব গল্প শুরু হল। যে গল্প কাঞ্চনজঙ্ঘা রোজ সকালে বলে থাকে মনোকামনা লেকের জলকে। সে দিন আমরা গিয়েও শুনতে পেলাম।

mulkarkha-valley-view-1

সেই গল্প মাথায় নিয়ে পূর্ণিমার হাত ধরে ওদের বাড়ি ফিরে এলাম। আরও এক দিন মুলকারখা থেকে উতরাইয়ের দিকে রওনা দিলাম। পথে পড়বে মনখিম, সিল্করুটের প্রথম স্টপ। আপনারা চাইলে মনখিমে এক দিন কাটিয়ে সিল্করুটের দিকে যেতে পারেন। তবে আমরা আর ওদিকে যাইনি। আমাদের চোখে তখন কাঞ্চনজঙ্ঘা আর মনোকামনার জাদু-বাস্তব গল্পের ঘোর। কলকাতায় ফিরেও যার উপসংহার খুঁজে পাচ্ছি না।

কী ভাবে যাবেন – এনজেপি থেকে যে কোনো গাড়ি ভাড়া করে লিংসে। এক দিন থেকে ওখান থেকে গাড়ি নিয়ে মুলকারখা।

যোগাযোগ – ললিত পডুয়াল।

           ০৯৮৩২৬৮১২৫৯

(কলকাতা থেকে ললিতের সঙ্গে যোগাযোগ করলে উনি লিংসে ও মুলকারখার গাড়ি ও হোমস্টে দুয়েরই ব্যবস্থা করে দেবেন।)

ছবি: রণজয় ব্যানার্জি

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here