khabor online most powerful bengali news

সবুজের সমুদ্র বাংরিপোসি

sakti-choudhuri-1শক্তি চৌধুরী

সে দিন সকালে যখন ধৌলি এক্সপ্রেস থেকে বালেশ্বর স্টেশনে নামলাম, আকাশের মুখ তখন বেজার। সারা রাস্তাই মেঘাচ্ছন্ন আকাশ দেখে দেখে আমরাও বেশ ক্লান্ত ও ভীত, গেল বোধহয় ট্যুর-টা। এই বালেশ্বর থেকে বাংরিপোসি যাওয়ার একটা লোকাল ট্রেন আছে সকাল ১১ টা নাগাদ এবং ওটাই সব চেয়ে সহজ উপায়। এ ছাড়াও গুচ্ছ টাকা খরচ করে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যায়। কিন্তু তা ট্রেন যাত্রার মতো আনন্দদায়ক নয়। গোটা ট্রেনলাইনে মাত্র একটা পাকা স্টেশন। বাকি সব মাটির, আর ওই সব অঞ্চলে আদিবাসী মানুষই বেশি থাকেন। খুব ভদ্র, সহজ, সাধারণ এই মানুষগুলো কিন্তু খুব রঙিন। ওদের কথা, ওদের বাঁশির আওয়াজ আর জানলার বাইরের সবুজ প্রকৃতি আপনাকে এক অন্য জগতের ডাক শোনাবে।

ঘণ্টা তিনেকের এই রাস্তাটা কিন্তু সত্যি সত্যি ভীষণ রিল্যাক্সড ট্যুর। আর যাঁরা লোকাল ট্রেন শুনে নাক কুঁচকোচ্ছেন, তাঁদের বলে রাখি ভিড় একেবারেই নেই, গদি মোড়া সিটে বসে এ রকম লোকাল ট্রেনযাত্রা এর আগে অন্তত আমি কখনও করিনি। তবে বাংরিপোসি স্টেশনটা প্রান্তিক স্টেশন হিসাবে পাকা স্টেশন। একে মধ্য শীত তার উপর মেঘলা আকাশ, শরীরের চেয়ে জামাকাপড়ের ওজন বেশি হবে সেটাই স্বাভাবিক। এই অবস্থায় যখন প্রায় ট্র্যাভেলব্যাগের মতো চেহারা নিয়ে আমরা এক একজন বাংরিপোসি স্টেশনে নামলাম, তখন বেলা অনেকটাই গড়িয়েছে। অতঃপর এক অটো ড্রাইভারকে পাকড়াও করে বাংরিপোসি লজে অবতরণ করা গেল। অনেকটা জায়গা নিয়ে তৈরি এই লজে থাকার ও খাওয়ার যথেষ্ট আরামদায়ক ব্যবস্থা আছে।

 

লজের কেয়ারটেকার যথেষ্ট কেয়ার নিয়ে আমাদের মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা করে দিল। সামনের রাস্তা থেকে অটো নিয়ে চললাম বুড়িবালামের তিরে। যেতে যেতে আপনাদের কয়েকটা কথা বলি।

road

এই জায়গাটা কোনো বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পট নয়, কলকাতা থেকে ২৩০ কিমি দূরে কলকাতা-পুরী রুটে বালেশ্বর জেলার এই জায়গাটা মানুষ মূলত পছন্দ করেন এর প্রকৃতি-নৈকট্যের জন্য। বাংরিপোসি টিলা-সহ বেশ কিছু ছোটো ছোটো পাহাড়ে এলাকাটা ঘেরা। পাহাড়গুলোর নীচে অসংখ্য গ্রাম ও চাষের খেত। সবুজ পাহাড় আর সবুজ খেত মিলেমিশে দিগন্তবিস্তৃত এক সবুজের সমুদ্রে পরিণত হয় এলাকাটা। আর এর সব চেয়ে মজা হল আপনিও নেমে পড়তে পারেন, ছুঁয়ে দেখতে পারেন সেই সমুদ্রের সৌন্দর্যকে। চুপ করে বসে থাকতে পারেন ওই মাঠের আলের উপর বা হেঁটে যেতে পারেন যত দূর চোখ যায়।

একটা কাজ করবেন। ওই একটু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে হাঁটা লাগাবেন কোনো একটা পাহাড়ের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে উঠে পড়ুন পাহাড়ের মাথায়…আরে না না বন আছে, তবে এখানে জীবজন্তু বিশেষ নেই। ভয়ের কিছু নেই। দারুণ অ্যাডভেঞ্চার হবে আর সব চেয়ে ভালো লাগবে যখন আপনি ওই উঁচু থেকে কুয়াশার চাদরে মোড়া নীচের মাঠ-ঘাট-গ্রামগুলোকে দেখবেন। সে এক অদ্ভুত সুন্দর ছবি। আপনি কি ছবি তুলতে ভালোবাসেন ? তা হলে ক্যামেরা অবশ্যই সঙ্গে নিয়ে যাবেন ও প্রচুর ভালো ভালো ছবি তুলবেন। ওই দ্যাখো, কথায় কথায় খেয়ালই করিনি, বুড়িবালাম তো এসে গেছে …।

buribalamedited

এ দিককার প্রায় সব নদীর মতো এই নদীতেও জলের সঙ্গে থাকে প্রচুর পাথর। ওই পাথরগুলোয় পা রেখে আপনি নদীর ভিতর বেশ কিছুটা যেতে পারেন। তার পর একটা উঁচু পাথরের উপর বসে পড়ুন। ‘ও নদী রে, একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে…’ গানটা মনে পড়ে গেল তো! পরিবেশটাই আপনাকে ভুলিয়ে দেবে অনেক কিছু। বন্ধুরা মিলে গল্প করুন বা পরিবারকে নিয়ে বসেই থাকুন, ভালো আপনার লাগতে বাধ্য। 

গল্প-আড্ডায় সময় কেটে গেল, সন্ধ্যা নামল বুড়িবালামের বুকে। একটা সুন্দর স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে উঠে পড়লাম আমরা, ফিরে চললাম আপন আস্তানায়। ভাবের আবেশ ভাঙল বাংরিপোসি বাজারে এসে। ভিতরের পেটুক বাঙালি ডাক দিয়েছে তখন। শুনেছি এখানকার ছানাবড়া খুব বিখ্যাত। ড্রাইভারকে জানাতেই সে নিয়ে গেল একটা অতি সাধারণ দেখতে দোকানে। হাজার হোক মেট্রোপলিটন ক্যাটেগরি সিটির লোক আমরা, কোয়ালিটির থেকে প্রেজেন্টেশনেই আগ্রহ বেশি। তাই দোকান দেখে দলের অনেকেই নাক সিঁটকোলেন তবে তাঁরাই ওখানকার ছানার জিলিপি আর বড়া খেয়ে, কিলোখানেক করে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন। 

buribalam-1

নিকষ কালো অন্ধকারে মোড়া আকাশে হাজারো তারার চুমকি বসানো রাতে শুধু লেপের তলায় বসে আড্ডা মারা ছাড়া আর কিছু করার নেই, যতক্ষণ না রাঁধুনি খাবার ঘরে তলব করে। আমরা অবশ্য কিছু স্টার ট্রেল ফোটোগ্রাফির উপর এক্সপেরিমেন্ট করে সময়টা কাটালাম। সারা দিনের ঘোরাবেড়ানো, তার পর গরম গরম মুরগির ঝোল ও রুটি। তোফা কাটল রাতটা লেপের আদরে।

সকাল সাড়ে ৯টায় ড্রাইভারদাদা তার গাড়ি নিয়ে উপস্থিত। যাওয়ার কথা প্রায় অবলুপ্ত ডোকরা শিল্পীদের এক গ্রামে। ঘণ্টা দেড়েকের ভিতর সেই গ্রামে পোঁছোলাম। এখানকার বিশেষত্ব হল, এঁরা মোমের ছাঁচে কাজ করেন। কাজের মান যথেষ্ট ভালো আর দামও খুব সস্তা। কলকাতার  বাজারে ওই সব জিনিস প্রায় তিন গুন দামে আমরা কিনে থাকি। আলাপ হল ওড়িশা সরকারের বিশেষ সম্মনিত শিল্পীদের সঙ্গে। তাঁদের ঘরে গিয়ে বসে কাজ দেখার সৌভাগ্যও হল। ওই গ্রামে যেমন ডোকরা শিল্প আছে, তেমনই অসাধারণ মাটির হাঁড়ি তৈরি হতে দেখেছি। কোনো রকম আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার না করে গ্রামের বয়স্ক মহিলারা কী অসাধারণ মাটির কাজ করেন তা ওখানে গিয়ে না দেখলে বোঝা মুশকিল।

bangriposhi-tribal-fare

বেশ অনেকটা সময় গ্রামে ঘোরাঘুরি করেছি। মূলত কৃষিজীবী মানুষগুলো খুবই সরল সাধারণ। প্রথম পর্বের ঘোরাঘুরি শেষ করে ফিরতে ফিরতে হয়ে গেল বেলা ২টো। লাঞ্চ করেই রওনা হলাম বিষয়ইর হাটের উদ্দেশে।

 

 

এশিয়ার সব চেয়ে বড়ো আদিবাসী হাট এই বিষয়ইর হাট। আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আসেন বেচাকেনা করতে। তবে চিনা দ্রব্যের প্রভাব মুক্ত হতে পারেনি এই হাটও। একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষগুলোর সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে পারেন এখানে। হাঁড়িভর্তি দেশি মদ থেকে কচ্ছপ, শজারুর মাংস — সব কিছুই পাওয়া যায়। মূলত চাষের জিনিসপত্র, ঝুড়ি, ধামা-কুলোর মতো আঞ্চলিক জিনিসপত্রের বিশাল সমাহার। আমরাও হারিয়ে গেলাম ওদের ভিড়ে বেশ খানিকক্ষণ। দিন শেষ। বেড়ানোও শেষ। মন খারাপ হয়ে গেল। বড়ো করে একটা নিঃশ্বাস নিলাম, যতটা সম্ভব অনুভব করলাম ওই মাটির গন্ধকে। ভালো করে চারদিকের মানুষগুলোকে দেখলাম । নাহ… কোথাও কোনো শহুরে নিস্পৃহতা নেই … বরং সরল ঔৎসুক্য নিয়ে বুঝতে চাইছে আমাদের।  

fare-edited  

থাকবেন কোথায়?

অল্প কিছু লজে থাকা-খাওয়ার ভিত্তিতে থাকা যায়, পারলে কলকাতা থেকেই বুক করেই যান।

যাবেন কী করে?

কলকাতা থেকে যে কোনো ট্রেনে বালেশ্বর। সেখান থেকে গাড়ি বুক (৩০০০ টাকা মতো) বা সকালের লোকাল ট্রেন আছে একটি মাত্র। ইন্টারনেটে আগে থেকে টাইম দেখে নিয়ে প্রোগ্রাম করুন।

খাবেন কী ?

রাস্তার ধারে খাওয়ার দোকান খুব একটা নেই। বাংরিপোসি বাসস্ট্যান্ডে কিছু খাওয়ার দোকান আছে। ব্রেকফাস্ট বা সন্ধ্যাবেলার খাবার ভালোই পাওয়া যায়, তবে লাঞ্চ বা ডিনারের জন্য হোটেলের উপর নির্ভর করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ছবি: লেখক

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন