ময়নাপুরের অক্ষয় স্মৃতি

0
41

sambhu

শম্ভু সেন

স্বামীজি সাগ্রহে পড়ি/পুঁথি শিরে রাখে ধরি/সাবাস শাঁকচুন্নি মাস্টার।/জননী সারদামণি/অক্ষয়ে ডাকাইয়া আনি/ আশীর্বাণী কহিলা তাহার।।/নবভাগবত কথা/গাহিলেন বসি যেথা/ নৈমিষারণ্য সম খনি।/রামকৃষ্ণ তীর্থমালা/বঙ্গভূমে সমুজ্জ্বলা।/ময়নাপুর তার মাঝে মণি।।

“শাঁকচুন্নি মাস্টার ?”

“বেঁটে, কালো, রুগ্ন শরীর, অযত্নে বর্ধিত দাঁড়িগোঁফ, মাথায় বিরাট পাগড়ি, মোটা ফ্রেমের চশমা।  সব মিলিয়ে এমন একটা চেহারা যা দেখে স্বামী বিবেকানন্দ ডাকতেন ‘শাঁকচুন্নি মাস্টার’ বলে। স্বামীজি যাঁদের ভালবাসতেন তাঁদের এই রকম অদ্ভুত সব নামে ডাকতেন।”

“কিন্তু মাস্টার কেন ?”

“খুবই দরিদ্র অবস্থা ছিল। যেটুকু লেখাপড়া করেছিলেন, সেটুকু সম্বল করে গ্রাম থেকে কলকাতায় চলে যান। মাস্টারি শুরু করেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে — নিজের শ্বশুরকুলের বিখ্যাত এক পূর্বপুরুষ সম্পর্কে এ ভাবেই বুঝিয়ে বললেন ময়নাপুরের স্বর্ণ সেন।

আরামবাগ থেকে কোতুলপুর পেরিয়ে বেশ খানিকটা গিয়ে সলদা মোড়। বাঁ দিকে গোকুলনগরের পথ। গোকুলনগর দেখে কুচিয়াকোল হয়ে এসেছি ময়নাপুরে। আরামবাগ থেকে কামারপুকুর- জয়রামবাটি হয়েও আসা যায় ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্যের নায়ক লাউসেন, তাঁর বাবা কর্ণসেন ও মা রঞ্জাবতীর উপাখ্যানের সঙ্গে জড়িত এই ময়নাপুরে। ‘ধর্মমঙ্গল’-এর লাউসেনের কাহিনি নিয়ে জড়িয়ে আছে আর এক ময়না — পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নাগড়।

বিতর্ক থাক। আপাতত আমরা কিংবদন্তির গ্রাম বাঁকুড়ার ময়নাপুরে। কথিত আছে, এখানকার হাকন্দ দিঘির পাড়ে বসে পুত্রকামনায় কঠোর তপস্যা করেন রানি রঞ্জাবতী। তপস্যার ফলে তাঁর মৃত্যু হলে ধর্মরাজ তাঁকে পুনর্জীবিত করেন এবং মনস্কামনা পূরণের বর দেন। তাই আজও ময়নাপুরের মানুষজন এই দিঘির জলকে গঙ্গাজলের মতোই পবিত্র মনে করেন। দিঘির পশ্চিম পাড়ে রয়েছে এক ভাঙাচোরা পশ্চিমমুখী পাথরের মন্দির। এই মন্দির হাকন্দ মন্দির নামে পরিচিত। মন্দিরের প্রতিষ্ঠালিপি না থাকায় এর বয়স নির্ধারণ করা যায় না। তবে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এই সপ্তরথ পীড়া-দেউলটি প্রাক মুসলমান যুগের এবং এটি বাঁকুড়া জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরাকীর্তি। মন্দিরের ভিতরে শিবলিঙ্গের অধিষ্ঠান, নাম হাকন্দেশ্বর। তবে আদতে এটি নাকি ধর্মরাজের মন্দির ছিল।

ময়নাপুরের নাম জড়িয়ে আছে আর একজনের সঙ্গে, মধ্যযুগের কবি শুন্যপুরাণ প্রণেতা রামাই পণ্ডিতের সঙ্গে। গ্রামের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে রয়েছে এক আধুনিক দালান মন্দির। এই মন্দিরে রয়েছে ‘যাত্রাসিদ্ধি রায়’ নামে ধর্মরাজের ছোট কূর্মমূর্তি। এই ধর্মরাজ নাকি রামাই পণ্ডিতের উপাসিত। আর জনশ্রুতি, সেই কবি শায়িত রয়েছেন মন্দিরের সামনের প্রাঙ্গণে মাকড়া পাথরের চাঙড়ের নীচে। ভাদ্র মাসে ধর্মরাজের বার্ষিক পুজো হয়, বৈশাখে হয় গাজন।

moyna

কিংবদন্তির লাউসেন বা মধ্যযুগের রামাই পণ্ডিত থাক, আমরা আসি আধুনিক যুগে। আজকের ময়নাপুর বেশি বিখ্যাত তার কৃতী সন্তান অক্ষয়কুমার সেনের জন্য। অক্ষয়কুমার ‘শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি’ রচয়িতা।

কুচিয়াকোল থেকে ময়নাপুর আসার মূল সড়কের বাঁ দিকে অক্ষয়কুমারের স্মারক মন্দির। তালাবন্ধ। প্রাঙ্গণেই আপন মনে খেলছিল একটি ছেলে। মন্দিরের আশেপাশে আমাদের ঘোরাঘুরি করতে দেখে কী ভাবে যেন সে আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে গেল। নিয়ে গেল রাস্তার উল্টোদিকে একটি বাড়িতে। চাবি হাতে বেরিয়ে এলেন মাঝবয়সি এক মহিলা, সেনবাড়ির বধূ, নাম স্বর্ণ সেন।

স্বর্ণদেবী প্রথমে নিয়ে গেলেন অক্ষয়কুমারের জন্মভিটের জায়গায়। সেখানেই রয়েছে সেই স্মারকলিপি, যাতে অক্ষয়কুমারকে ‘শাঁকচুন্নি মাস্টার’ বলে সম্বোধন করেছেন স্বামী বিবেকানন্দ।

এর পর মন্দির খুললেন। ভিতরে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ-সারদার মূর্তি। রয়েছে অক্ষয়কুমারের পাগড়ি-পরিহিত মূর্তিও। মন্দিরের মেঝেতে বসেই স্বর্ণদেবীর কাছে অক্ষয়কুমারের গল্প শুনছিলাম।

“একদিন শুনলেন ঠাকুর জমিদারির প্রবীণ কর্মী দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার আর ঠাকুর পরিবারের সদস্য ধীরেন্দ্র কোন এক পরমহংসকে নিয়ে আলোচনা করছেন। অক্ষয়কুমার জানতে চাইলেন কোন পরমহংস সম্পর্কে তাঁরা বলাবলি করছেন। দেবেনবাবু খুব একটা পাত্তা দিলেন না। অক্ষয়কুমার কিন্তু লেগে থাকলেন। এক দিন ধীরেন্দ্রর কাছে জানতে পারলেন এই পরমহংস হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ, থাকেন দক্ষিণেশ্বরে। শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখার ইচ্ছে প্রচণ্ড, কিন্তু কলকাতা বা তার আশেপাশের কোনও জায়গাই চেনেন না অক্ষয়। শেষে সুযোগ জুটল। শ্রীরামকৃষ্ণ আসছেন তাঁর ভক্ত মহিমাচরণের বাড়িতে, সেখানে চলেছেন দেবেন্দ্র ও ধীরেন্দ্র। দেবেনবাবুর হাতেপায়ে ধরে অক্ষয়ও চললেন তাঁদের সঙ্গে।

সেই প্রথম সাক্ষাৎ। শ্রীরামকৃষ্ণের পায়ের ধুলো নিলেন অক্ষয়। শ্রীরামকৃষ্ণ তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে যে কী ছিল তা ব্যাখ্যা করা যায় না। এই সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে অক্ষয়কুমার লিখেছেন, ‘মনে হচ্ছে, আমি আমার পুরনো আমিকে ভুলে গেলাম। একটা নতুন স্রোত বইতে শুরু করল। আমার পুরনো দেহে নতুন অস্তিত্বের জন্ম হল’। দু’-তিন দিন পর এক বন্ধুর সঙ্গে গেলেন দক্ষিণেশ্বরে। তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে চাইলেন শ্রীরামকৃষ্ণ, ব্রাহ্ম কিনা তা-ও শুধোলেন। ফিরে আসার সময় পায়ের ধুলো নিতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন অক্ষয়। এর পরেও কয়েক বার যখনই পরমহংসকে প্রণাম করতে গেছেন অক্ষয় তখনই শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘আগে পবিত্র হও, তার পর এ সব কোরো’। অক্ষয়কুমারের কথায়, ‘আমার সঙ্গে তিনি যে ব্যবহার করতেন, সেই ব্যবহার যদি অন্য কারও সঙ্গে করা হত, তা হলে সেই ব্যক্তি প্রভুর কাছে ফিরে আসতেন না। কত ভক্ত তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন। আর আমি যখন করতে যেতাম, উনি পা সরিয়ে নিতেন। কখনও কখনও পিছিয়ে গিয়ে বলতেন, থাক, থাক।’ কিন্তু অক্ষয় দমলেন না। তিনি স্থিরনিশ্চিত, একমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে তাঁর অভীষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারেন।”

আমরা মুগ্ধ হয়ে স্বর্ণদেবীর কথা শুনছিলাম। তিনি বলে চলেছেন, “এর পর এক দিন দেবেন্দ্রকে বললেন, তিনি যেন শ্রীরামকৃষ্ণকে বলেন, অক্ষয় তাঁর আশীর্বাদ চেয়েছেন। দেবেন্দ্র শ্রীরামকৃষ্ণকে জানালেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, ‘আমি কী বলব ? তুমি ওকে কিছু উপদেশ দাও’। অক্ষয়কে অবিরাম হরিনাম জপতে বললেন দেবেন্দ্র। কিছু দিন পর দেবেন্দ্র তাঁর বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণের সম্মানে উৎসব করলেন। সেখানে অক্ষয় তাঁর পায়ের ধুলো নিলেন। মন খুশিতে ভরে গেল।

এর পর এল সেই দিন, ১৮৮৬-এর পয়লা জানুয়ারি। কাশীপুর উদ্যানবাটীতে শ্রীরামকৃষ্ণের কল্পতরু হওয়ার দিন। অক্ষয়কুমার লিখেছেন, ‘বেলা ৩টে নাগাদ প্রভু নীচে নেমে এলেন। বাগানের পথ দিয়ে হেঁটে চললেন। পিছনে ভক্তরা। প্রভু বাগানে এসেছেন শুনে যে যে দিক থেকে পারল ছুটে এলো।… আমি প্রভুর এক পাশে ছিলাম। আমার হাতে দুটো চাঁপা ফুল ছিল। মহান ভক্ত গিরিশ প্রভুর সঙ্গে কথা বলছিলেন।… মারাত্মক অসুস্থতায় প্রভু কষ্ট পেলেও সে দিন তাঁর মুখমণ্ডল ছিল উদ্ভাসিত, জ্যোতির ছটা সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ছিল। … প্রভু ভক্তদের আশীর্বাদ করে বলছিলেন, ‘তোদের চৈতন্য হোক। আর কী বলতে পারি ?’ এ বার ঘরে ফেরার পথ ধরলেন। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়েছিলাম। আমাকে ডেকে বললেন, ‘কী রে ছেলে, কী করছিস ?’ তার পর আমার কাছে এলেন, তাঁর হাত দিয়ে আমার বক্ষ স্পর্শ করলেন, কানে কানে কিছু আবৃত্তি করলেন। সে ছিল মহামন্ত্র।… আমি কী দেখলাম আর কী শুনলাম ? আমি শুধু বলব, আমার ইচ্ছা সে দিন পূর্ণ হল। বাকি জীবন যেন আমি শ্রীরামকৃষ্ণের মহিমাকীর্তন করে যেতে পারি।”

আপ্লুত হয়ে গেছিলাম অক্ষয়কুমারের জীবন-কথায়। চটক ভাঙল স্বর্ণদেবীর কথায়, “জীবনে সেটাই করেছিলেন অক্ষয়কুমার। চার খণ্ডে লিখলেন শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও বাণী। ১৯০১ সালে সেই চার খণ্ডকে এক করে প্রকাশিত হল শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি। বই পড়ে স্বামী বিবেকানন্দ এক চিঠিতে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে লিখলেন, ‘এই মাত্র অক্ষয়ের বই পড়লাম। আমার তরফে তাকে হাজার হাজার আলিঙ্গন দিও। তার কলমের মাধ্যমে শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেকেই প্রকাশ করেছেন। অক্ষয় তুমি ধন্য… এই বই পড়ে আমার যে কী আনন্দ হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না… প্রিয় অক্ষয়, আমার ভাই, প্রিয় ভাই, তোমাকে আমার সমস্ত অন্তর দিয়ে আশীর্বাদ করি।…’ শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী ও মহিমা নিয়ে তিনি আরও বই লিখেছেন। জয়রামবাটিতে মা সারদার কাছে প্রায়ই ছুটে যেতেন। সারদাকে ‘মা’ বলে ডেকে ধন্য হতেন।”

কখন যে সন্ধে নেমেছে খেয়াল করিনি। স্বর্ণদেবী ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সন্ধের বাতি জ্বালাতে।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে বা বাসে আরামবাগ গিয়ে সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে ময়নাপুর। ঘণ্টা খানেকের পথ।

কোথায় থাকবেন

থাকবেন আরামবাগে। থাকার মতো ভালো লজ বা হোটেল আছে।

ছবি- সৌজন্য ফেসবুক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here