দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবের ব্যান্ডেল চার্চ এবং ‌ইমামবাড়া

0
242

শিখা দত্ত

ব্যান্ডেল চার্চের পোশাকি নাম ব্যাসিলিকা অব হোলি রোজারি। আর ব্যান্ডেল কথাটির মানে হল বন্দর। হুগলির এই এলাকাটি এক সময়ে প্রসিদ্ধ বন্দর ছিল। এখানে গজিয়ে উঠেছিল পর্তুগিজ উপনিবেশ। থাকতেন পর্তুগিজ বণিকেরা।

চার্চে ঢোকার মুখে একটি ফলকে লেখা আছে চার্চের প্রতিষ্ঠাসাল। ১৫৯৯ সালে চার্চটির পত্তন হয়। পশ্চিমবঙ্গ ‌তো বটেই সারা ভারতের নিরিখে এটি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রাচীন এক পবিত্র স্থান।

বিজ্ঞাপণ

রবিবারের বিকেলে চার্চে ভালো রকমই জনসমাগম হয়েছে। অনেকটা জায়গা নিয়ে চার্চের চৌহদ্দি। বোরখা পরা মুসলমান তরুণী থেকে মুণ্ডিতমস্তক জনা দুয়েক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে চার্চের শোভা দ‌েখতে দেখা গেল।

উপাসনার দিনে চার্চে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ যেমন এসেছেন, আবার অনেকেই কোনো ধর্মীয় আচার পালনের উদ্দেশে আসেননি। এসেছেন এমনিই খানিক বেড়াতে।

চার্চের ভিতরকার পরিবেশ খুব শান্ত ও পবিত্র। দর্শনার্থীরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। উপাসনাস্থলে প্রভু যিশু ক্রুসবিদ্ধ অবস্থায়। সেখানে সিস্টার ও ফাদার ভক্তদের সঙ্গে নিচু গলায় কোনো জরুরি কথা বলছেন। আর ভক্তদের অনেকেই বেদিতে মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন। তারা যে সকলেই খ্রিস্টান, তা কিন্ত নয়!

ব্যান্ডেল এলাকাটিকে বন্দর হিসাবে ব্যবহার করতেন পর্তুগিজরা। শাহজাহানের কাছ থেকে প্রচুর জমি পেয়েছিলেন ওই পতুর্গিজ বণিকেরা। এর পরে ধর্মকম্মো করার জন্য তাদের চার্চ নির্মাণের দরকার হয়ে পড়ে। সেই সময়ে বহু স্থানীয় মানুষকেও ধর্মান্তরিত করেছিলেন যাজকরা।

তবে ১৬৩২ সালে এই চার্চটি একবার পুড়ে গিয়েছিল। পরে পরিস্থিতি সামলে নিয়ে পুনর্নির্মাণ হয়।

সে যাই হোক, চার্চে ঢুকলে মন ভালো হয়ে যাবে। সুশৃঙ্খলতাও এক রকম পবিত্র ভাবের সঞ্চার করে।

প্রাচীন সময়ে এক পর্তুগিজ ক্যাপ্টেন বঙ্গোপসাগরের ঝড়ের মুখে তার জাহাজটিকে সলিলসমাধি থেকে কোনো ক্রমে উদ্ধার করেন। ক্যাপ্টেনের মনে হয়েছিল, মা মেরির কৃপাতেই রক্ষা পেয়েছেন তাঁরা। ওই জাহাজের মাস্তুলটি এখনও চার্চে প্রদর্শিত হচ্ছে। সে-ও দেখার মতোই বটে!

ব্যান্ডেল চার্চে স্বামীজির বাণী।

চার্চে প্রদর্শিত হচ্ছে স্বামী বিবেকানন্দের বাণীও। স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনার অষ্টম খণ্ড থেকে তুলে আনা প্রভু যিশুর সম্পর্কে স্বামীজির বক্তব্য পড়া গেল। সেখানে স্বামীজি বলেছেন, “যিশুর জীবনের পশ্চাতে এমন কিছু আছে, যাহা অবশ্য সত্য। এমন কিছু আছে, যাহা আমাদের অনুকরণের যোগ্য।”

চার্চ থেকে বেরিয়ে দেখি আকাশ বেশ মেঘলা। বৃষ্টি অবশ্য হল না। একটা অটো ধরে ইমামবাড়ায় পৌঁছোলাম।

১৮৪১ সা্লে ইমামবাড়া ‌নির্মাণের কাজ শুরু করেন মহম্মদ মহসিন। কাজ শেষ হয় ১৮৬১ সালে। ইমামবাড়া ভবনটি দোতলা। প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকেই নজরে পড়বে ইমামবাড়ার চওড়া চাতাল। দু’পাশে সারবন্দি ঘর। সেগুলির বেশির ভাগই অব্যবহৃত, ধুলোময়লায় ভর্তি।

ইমামবাড়ার ঘড়িটি প্রসিদ্ধ। ঘড়িটি আছে টাওয়ারের ওপর। টাওয়ারে পৌঁছোতে গেলে ভাঙতে হবে মোট ১৫২টি সিঁড়ি। ইমামবাড়ার ঘড়িটি বহুমূল্য। ১৮৫২ সালে এই ঘড়িটির বাজারদর ছিল ১১ হাজার ৭২১ টাকা। প্রস্তুতকারকের নাম, সৈয়দ কেরামত আলি। ঘড়িটির ওজন ২০ কেজি।

তবে বর্তমানে ইমামবাড়ার ভগ্নদশা। জানা গেল, ভবনটি সংস্কারের কাজ চলছে। এ বছরের ভিতরই শেষ হবে সংস্কারের কাজ।

এখানেও ভ্রমণার্থীদের দেখা মিলল। ইমামবাড়ার ভিতর কয়েক জন তরুণী স‌েলফি তুলতে ব্যস্ত। তবে দুর্ঘটনার ভয় নেই।

ইমামবাড়ার প্রবেশফটক।

ইমামবাড়ায় দর্শনার্থী হিসাবে ঢুকতে মাথাপিছু ১০ টাকা করে লাগে। গেটকিপার মহম্মদ সেলিম খবরের জগতের লোক শুনে আমার থেকে দক্ষিণা নিলেন না। ঘুরে ঘুরে দেখলাম। যেন অনেক পুরোনো দিনের গন্ধ পেলাম। আমার মনে হয়, গন্ধটা নিশ্চিত ভাবেই ঐতিহ্যের!

চার্চ ও ইমামবাড়া দেখে যখন হুগলি ঘাট স্টেশনে কলকাতায় ফেরার জন্যে ট্রেনের অপেক্ষা করছি, সেই সময়ে কবিগুরুর কবিতার একটি লাইন অবচেতনে থেকে উঠে এল।  সত্যিই তো এই ভারতের ঐতিহ্যই হল দিবে আর নিবে, মিলাবে মি‌লিবের!

কী ভাবে যাবেন

ব্যান্ডেল চার্চ আর ইমামবাড়া একই দিনে দেখে নিতে পারেন। ব্যান্ডেল চার্চ দেখা হলে চার্চ থেকে বেরিয়েই ইমামবাড়া যাওয়ার অটো পেয়ে ‌যাবেন। ইমামবাড়া অটোতে বড়জোর ১০ মিনিটের পথ। কলকাতা থেকে যদি য‌ান, তা হলে লোকাল ট্রেনে ব্যান্ডেল স্টেশনে নেমে ব্যান্ডেল চার্চে যাওয়ার অটো ধরুন। ইচ্ছা হলে একটা গোটা অটো বুকও করতে পারেন। আবার শাটলেও যাওয়ার বন্দোবস্ত আছে।

বিজ্ঞাপন

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here