অতীন্দ্রিয় উত্তরপূর্ব ১০: বৃষ্টির বাড়ি সোহরা

0
33

moitryমৈত্রী মজুমদার

ডাওকি থেকে ফেরার পথে ‘Y’ বাঁকের মুখে ঠিক করলাম চেরাপুঞ্জির দিকে ঘুরে যাই। এত সুন্দর মেঘলা দিনে যদি মেঘের দেশে নাই থাকি তবে আর কবে থাকব। আর বাদলঘন গহন দিনে পৃথিবীর সব থেকে বৃষ্টিসিক্ত জায়গায় থাকার সৌভাগ্যই বা ক’জনের হয়। 

way-to-cherra-1

এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখি। মেঘালয় মেঘের রাজ্য, তাই এখানে বেড়াতে আসার জন্য বর্ষাকালই সব থেকে উপযুক্ত সময়। যদিও বছরের বেশির ভাগ সময়ই এখানে বৃষ্টি হয়, তবুও আপনি-আমি তো আর এখানে রোজ রোজ আসব না। তাই কোনো রকম ঝুঁকি ছাড়া সব থেকে ভালো ভাবে মেঘালয় উপভোগ করতে হলে বৃষ্টি সুনিশ্চিত করতে হবে। আর তাই বর্ষাকালই ভরসা-কাল। ঘন সবুজ পাহাড়ের ঢাল, চার পাশে ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলাতে থাকা চ্যাপটা পাহাড়চূড়া।  মাঝখান দিয়ে কালো পিচের রাস্তা, বেশির ভাগ সময়ই ফাঁকা, জনমানবশূন্য।

way-to-cherra-2

মাঝেমাঝে ছোটোখাটো গ্রাম এসে পড়ে। গ্রামের বাড়িগুলো সুন্দর ছোটোখাটো, বাড়ির বারান্দায় অবশ্যম্ভাবী ফুলের টব সযত্নে সাজানো।বাড়ির আঙিনায় বা ছাদে  কম্বল, সোয়েটার দড়িতে ঝুলছে। কোথাও বা রাস্তায় ছোটো ছোটো কয়েকটা বাচ্চা খেলা করছে। আবার গ্রাম পেরোলেই সবুজ ঘাসে ঢাকা সমতল, পরতে পরতে ভাসমান মেঘের ভেলার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি মারছে পাহাড়ের ঢাল। কোথাও পাহাড়ের ওপরে পাইনের সারি। আর রাস্তার বাঁকে বাঁকে হঠাৎ হঠাৎ গাভীর মতো চরতে থাকা মেঘেদের রাস্তা আটকে দাঁড়ানো।

road-with-clouds

এই সব নৈসর্গিক দৃশ্য আর পরিবেশের মাঝখান দিয়ে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝামাঝি দুলতে দুলতে পৌঁছোলাম চেরাপুঞ্জি, যার আসল মানে স্থানীয় নাম সোহরা। ব্রিটিশদের মুখে মুখে নাম বদল হয়ে হয়ে গেছিল চেরাপুঞ্জি, মানে কমলাগুচ্ছ।

যে হেতু বেশ দুপুর-দুপুর পৌঁছেছিলাম, তাই ভাবলাম ঘরে মানে রিসোর্টে না ঢুকে আশপাশটা দেখে নেই। সোহরাতে প্রধানত দ্রষ্টব্য বলতে গেলে, একাধারে পাহাড়ি ঝরনা, গুহা আর অন্য দিকে ডাবলডেকার লিভিং রুট ব্রিজ। সোহরায় ঢোকার  মুখ থেকেই এই পাহাড়ি ঝরনারা আপনাকে স্বাগত জানাবে। দেখতে পারেন কিনরেম, নংস্থাং, মাওসুমাই, সেভেন সিস্টার ফলস, নওকালিকাই এর মতো ৭-৮টি পাহাড়ি জলপ্রপাত। যার মধ্যে নওকালিকাই ভারতের উচ্চতম জলপ্রপাত। এ বার বৃষ্টি যত বেশি ঝরনার জলের ধারাও তত বেশি। তাই বর্ষা কালে ভালো দেখা যায়। কিন্তু আবার কখনও কখনও মেঘ এসে আপনার দর্শনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তখন ধৈর্য ধরে অপেক্ষার পালা।

seven-sisters-waterfall

এর পর দেখার পালা মাওসমাই কেভ। টিকিট কেটে এগোলাম ঠিকই, গুহার মধ্যে প্রবেশও করলাম। জল জমে থাকা, স্যাঁতস্যাঁতে পাথুরে গুহা। ইলেকট্রিক আলোয় আলোকিত করা আছে, বাইরে  ম্যাপ এঁকে প্রবেশ-প্রস্থান বোঝানোও আছে। কিন্তু না, হাত বিশেক যাওয়ার পর আর সাহসে কুলোলো না। বেরিয়ে এলাম। আমার মতে, যদি আপনি শীর্ণকায় হন এবং শ্বাসপ্রশ্বাস জনিত এবং অস্থিজনিত কোনো রকম অসুবিধে আপনার না  থাকে, তা হলেই পুরোপুরি ভিতরে ঢোকার রিস্ক নিতে পারেন। না হলে মাঝপথে অসুবিধায় পড়তে পারেন। অবশ্য বাইরে থেকে গাইড নিয়ে যেতে পারেন। এ সব ক্ষেত্রে আপনার গাড়ির চালক স্থানীয় হলে, সে-ও আপনাকে সাহায্য করবে।

mawasmai-cave

এ সব দেখে বেরিয়ে আসার সময় বিভিন্ন গেটের বাইরে স্থানীয়দের পসরা আছে, সেখান থেকে পাহাড়ি দারুচিনি, আদিবাসীদের তৈরি আচার, তাদের হাতে বোনা চাদর, মাফলার, টুপি ইত্যাদি কিনতে পারেন। দুপুরের খাওয়াও সারতে পারেন। আর রাতে থাকার জন্য আছে বেশ কিছু হোমস্টে। আমার রাতের আস্তানা সে দিনের মতো হল চেরাপুঞ্জি রিসোর্ট। এটিও একটি হোমস্টে, মূল শহর থেকে ৫-৬ কিমি দূরে। ঘরোয়া পরিবেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ঘরোয়া সুস্বাদু খাবার। বৃষ্টি না থাকলে বাইরের লনে বনফায়ারের ব্যবস্থা করা হয়। আর এই রিসোর্টের মালকিন  খুবই বন্ধুভাবাপন্ন, এবং গাইড-সহ সাইটসিয়িং-এর ব্যবস্থা করে দেন। পরের দিন তাই রুট ব্রিজ দেখার পরিকল্পনা ওঁর সঙ্গেই করলাম। 

 

cherra-vally-from-top

 

রাতে জোর বৃষ্টি নামল। সারা রাত অঝোরে ঝরার পর সকালেও থামার কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। কী হয়, কী হয়, ভাবতে ভাবতে স্নান, ব্রেকফাস্ট সারলাম। চেরাপুঞ্জি বা সোহরা এ রকমই। এখানে এলে আপনার দেখা হবে নৈসর্গিক নিস্তব্ধতার সঙ্গে। বিরাট আকাশের তলায় প্রকৃতির একদম কোলের কাছে বসে ঝোড়ো বাতাসের সঙ্গে ফিসফিস আর একাকী নির্জনতার সঙ্গে বাক্যালাপ করার এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন আপনি। কিন্তু তার জন্য হাতে সময় নিয়ে আসা জরুরি। আমার হাতে এ বার সময় কম, কারণ এ বার তো সময় চুরি করে আসা মাওলিংনং থেকে। এ সব ভাবছিলাম, ততক্ষণে বৃষ্টিও থামল। এ বার আমরাও তৈরি রুট ব্রিজ দেখার জন্য। বাইরে এসে দেখি মেঘ সরে যাওয়ায় বাংলোর লন থেকে নীচে বাংলাদেশের সবুজ সমতল পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বাহ, কিছু না থাক, সারা দিন এই দৃশ্য দেখেও তো কাটিয়ে দেওয়া যায়। 

cherra-view

পাহাড়ি জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে নীচে নামার পালা। এই পথে হাতে লাঠি থাকা জরুরি। গাইড বলল ২৫০০ থেকে ৬০০০ সিঁড়ি নামতে হবে, আবার উঠতেও হবে। শোনার পর থেকেই বুক দুরু দুরু শুরু, কে জানে বাবা, পারব তো? ভাবতে ভাবতে আবার নামল বৃষ্টি, ফিরে এলাম বাংলোতে। নাহ, এ যাত্রায় আর ডাবলডেকার রুট ব্রিজ দেখা হল না। দুপুরের খাবার খেয়ে তাই শিলং অভিমুখে যাত্রা শুরু।

double-decker-root-bridge

মেঘের ওড়নায় ঢাকা রাস্তা, মাঝে মাঝে অঝোর ধারায় বৃষ্টি, আবার কখনও মেঘের ফাঁকে সূর্যের আলোর রোশনাই, এ সব দেখতে দেখতে গাড়িতে ফিরছি।  মাঝে মাঝেই পাহাড়ি পথে বৃষ্টির জলের ধারায় তৈরি হয়েছে ছোট বড়ো ঝরনা। এটাই তো মেঘালয়, এটাই তো পৃথিবীর সিক্ততম দেশ। এর অপার সৌন্দর্য  দেখতে দেখতে নামতে থাকলাম বাড়ির পথে। কিন্তু না শিলং পৌঁছোতে পৌঁছোতে  সন্ধে হয়ে গেল। যদিও আজকাল রাস্তা খুবই ভালো হওয়ার দৌলতে শিলং থেকে গুয়াহাটি আড়াই-তিন ঘণ্টায় পৌঁছোনো যায়, তবুও রাতটা থেকেই যাব ভাবলাম। তবে শিলং-এ নয়, ১৫ কিমি এগিয়ে বরাপানিতে, অর্কিড লেক রিসোর্টে।

views-from-orchid-lake

আপনাদের হাতে সময় থাকলে শিলং-এ এসে অবশ্যই বাম্বু হাট বা ব্রডওয়েতে চাইনিজ খাবার চেখে দেখবেন। নির্দ্বিধায় বলতে পারি, জীবনের সব থেকে সেরা চাইনিজ খাওয়ার অভিজ্ঞতাও হতে পারে এটি। 

বরাপানি বা উমিয়াম লেক। মনুষ্যসৃষ্ট সর্ব বৃহৎ লেক। ১৯৬০ সালে উমিয়াম নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তৈরি হয়েছে এই জলাধার। আর  অর্কিড লেক রিসোর্ট একদম এই লেকের গায়েই। ভিড় না থাকলে লেক ফেসিং  ঘরও পেয়ে যেতে পারেন। সকালে এই লেকের জলে নৌকাবিহার, কায়াকিং ইত্যাদি করতে পারেন। আবার কিছুমাত্র না করে সুবিশাল লেকের জলরাশির দিকে তাকিয়ে, ঠান্ডা হাওয়া খেতে খেতে কফির কাপে চুমুক দিয়েও অনেকটা সময় কাটিয়ে দিতে পারেন। 

barapani

আমরা অবশ্য বেশি দেরি না করে ব্রেকফাস্ট খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম। শিলং-গুয়াহাটির পাহাড়ি পথ আজকাল যে কোনো ইন্টারন্যাশনাল হাইওয়ের সমকক্ষ  হওয়ার দাবি রাখে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, রাস্তায় সোলার প্যানেল লাগানো স্ট্রিট লাইট। নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আর কী চাই? মাঝপথে নংপো-তে গাড়ি থামিয়ে লাঞ্চ সারলাম। নংপোই শিলং যাওয়া-আসার পথে একমাত্র জায়গা যেখানে খাওয়াদাওয়া সারা যায়। তাই টুরিস্টরা লাঞ্চ, ব্রেকফাস্ট এখানেই সারেন। আজকাল খুবই ভালো একটা রেস্তোরাঁ খুলেছে এখানে, ‘জিভা’, শুনেছিলাম বন্ধুদের মুখে, তাই  পরখ করতে ঢুকে পড়লাম সেখানে। না, খুব ভুল শুনিনি জায়গাটার কথা।

hilly-way-with-hills-and-valley

নংপো-র আর একটা বৈশিষ্ট্য হল আদিবাসীদের বাজার। এখানে খাসিয়াদের বাড়িতে তৈরি মাছ, মাংস, বাঁশ, সবজি ইত্যাদি সব রকম আচার আর আনারস, মিষ্টি কুমড়ো ইত্যাদি অরগানিক সবজি শাক, বাজার করতে পারবেন। সত্যিই যার আস্বাদ জীবনে অন্তত এক বার নেওয়াই উচিত। 

way-to-cherra

রসনার তৃপ্তি আর মনের সুখে বাজার সেরে আমরা এ বার বাড়ির পথে। শিলং  পাহাড়ে বারবার ফিরে আসার মনোবাঞ্ছা, সে-ও চিরকালীন। এর পর জয়ন্তিয়া আর গারো পাহাড়ও যাব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সঙ্গে নিশ্চয় থাকবেন আপনারা।  এ ছাড়া বাকি থেকে গেল মিজোরাম, মণিপুর, অরুণাচলের রকমারি অভিজ্ঞতা। সে সবই হবে আগামী বছরের কোনো সময়। তা হলে এবারের মতো উত্তরপূর্ব দর্শন এই ১০ নম্বর পর্বেই শেষ হোক। পায়ে পায়ে কখন যে ১০ সপ্তাহ পার হয়ে গেল…। 

ছবি: লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here