অতীন্দ্রিয় উত্তরপূর্ব ৯ : মেঘের দেশে মাওলিংনং

0
6

moitryমৈত্রী মজুমদার :

বেশ কিছু দিন আগে ফেসবুকে একটি নিবন্ধ দেখেছিলাম। ভারতের বেশ কিছু না জানা প্রত্যন্ত গ্রাম বা জনপদের নাম ছিল সেখানে, যারা কিনা বিশেষ বিশেষ কারণে শুধু দেশেই নয় বিদেশেও দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। তাদের মধ্যে সবার প্রথমে যে নামটি ছিল সেটি ‘মাওলিংনং’ নামে মেঘালয়ের এক গ্রামের। সে জায়গা নাকি এশিয়ার মধ্যে সব চেয়ে পরিচ্ছন্ন এক গ্রাম। ২০০৩-২০০৪ নাগাদ নাকি এই উপমা পেয়েছে গ্রামটি।

লেখাটি পড়ার পর থেকেই উত্তরপূর্বের বাসিন্দা হিসেবে গর্বিত হয়েছি। কারণ, পাওয়ার থেকে না-পাওয়ার ফর্দ যাদের বড় তাদের জন্য এ বেশ চাঞ্চল্যকর বিষয়। আবার আশ্চর্যও হয়েছি সে অবধি তথ্যটি অজানা থাকার কারণে। কিন্তু সব চেয়ে বেশি যা হয়েছিলাম তা হল কৌতূহলী।

তাই সুযোগ খুঁজে পাড়ি জমালাম সেই পথে। গবেষণা বলছে, শিলং থেকে প্রায় সাড়ে ৪-৫ ঘণ্টার যাত্রা। যেতে হবে মেঘালয়-বাংলাদেশ বর্ডারের দিকে। তাই বেশ সক্কাল সক্কালই বেরিয়েছিলাম। অসম-মেঘালয় সীমান্ত, খানাপারা পেরিয়ে এক দিকে অসম আর অন্য দিকে মেঘালয়কে রেখে মাঝখানে চলেছে জাতীয় সড়ক। তার পর আঁকা বাঁকা পাহাড়ি পথে জোড়া বাট পেরোলেই শুরু শিলং পাহাড়ের রাস্তা।

way-to-mawlynnong

আহা, কী যে অপরূপ তার সৌন্দর্য। স্বামী বিবেকানন্দ পদব্রজে ভারত ভ্রমণকালে বলেছিলেন, কাশ্মীরের পর ভারতের সব থেকে সুন্দর জায়গা হল উত্তরপূর্ব। সে কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে মানি। কিন্তু তার মধ্যেও আমার মতে মেঘালয় হল সর্বোত্তম। সে আপনি খাসি হিলস-এই যান, বা জয়ন্তিয়ায় কিংবা গারো পাহাড়ে। প্রকৃতি যেন তার সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ উজাড় করে দিয়েছে এই তিন পাহাড়ের অলিগলি, গুহা কন্দরে। কি বেশি কবিত্ব হয়ে গেল নাকি? সে না হয় হলই বা একটু। বাঙালির মননে শিলং পাহাড়ের আকর্ষণ কি আজকের। সেই যবে থেকে দাড়ি-বুড়োর নায়ক অমিত, শিলং পাহাড়ের রাস্তাঘাট পেরিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে শিলচরের উপত্যকায় ঘুরে বেড়িয়েছে, তখন থেকেই। তার পিছু পিছু বাঙালি মনও তার মনশ্চক্ষু দিয়ে সে সব জায়গার গাছগাছালি, পাখপাখালির দর্শন সেরেছে বার বার। আমিও তেমনই। সে সব কথা ভাবতে ভাবতে আর নীল আকাশে মেঘের ভেলা দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলেম শিলং। পুলিশবাজার পৌঁছোনোর আগেই ডাইনে শিলং পিকের দিকে ঘুরল গাড়ি। এ বার যাত্রা শুরু ‘মাওলিংনং’-এর উদ্দেশে। শহর থেকে যত দূরে যাওয়া শুরু তত কাছাকাছি আসা শুরু প্রকৃতির।

মেঘালয় যে হেতু ক্ষয়জাত পর্বতের দেশ, তাই হিমালয়ের পাহাড়ি এলাকাগুলোর থেকে এর একটা পরিষ্কার পার্থক্য আছে। এখানে পাহাড়ের মাথাগুলো চ্যাপ্টা, যাকে টেবিল টপ বলে। আর পুরোটাই মোটামুটি নাগালের মধ্যে। মানে দুর্লঙ্ঘ্য পর্বতচূড়া নেই এই অঞ্চলে। বেশির ভাগটাই মোটরেবল আর ঘন সবুজে আবৃত। আর যে যে বিশেষত্ব এড়িয়ে যাওয়ার নয় তা হল মাঝে মাঝেই দিগন্ত বিস্তৃত সমতল ঘাসজমি, এ দিক ও দিক ছোটো বড়ো ঝর্নার বয়ে যাওয়া, পাইন গাছের ফাঁকে কোথাও কোথাও সুপুরি গাছের উঁকিঝুঁকি। সে সৌন্দর্য শব্দে বর্ণনার থেকে চোখের ক্যামেরায় বন্দি হওয়ার বেশি উপযুক্ত।

কিছু সময় পাহাড়ি পথে চড়াইয়ের পর এ বার উতরাই-এর পালা। লম্বা লম্বা ঘাসের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে কিছুটা সরু হয়ে যাওয়া রাস্তা। সেই রাস্তা পেরিয়ে এ বার আমরা এসে উপস্থিত রিওওয়াই গ্রামে। এখান থেকে বাঁ দিকে এক-দেড় কিমি গেলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে ‘মাওলিংনং’।

 

root-bridge-2

মনের কৌতূহল বাধা মানছে না পরিচ্ছনতম গ্রাম দেখার জন্য। কিন্তু গাড়ির ড্রাইভার বলল, এই খানে আছে ‘লিভিং রুট ব্রিজ’। শুনেই মনে পড়ল, আরে তাই তো  উত্তেজনায় ভুলেই গেছিলাম ‘লিভিং রুট ব্রিজ’-এর কথা। কৌতূহল জাগানোর জন্য এ-ও বা কী কম? খাসিয়া জনজাতির মানুষের হাতে সযত্নে বহু বহু বছরের প্রচেষ্টায় তৈরি এই ব্রিজগুলি খাসিয়া পাহাড়ে পাওয়া যাওয়া রাবার জাতীয় গাছের শিকড় গজিয়ে বানানো। আর এটি একটি পাহাড়ি ঝোরার ওপর সেতু, তাই সেই ব্রিজ পর্যন্ত পৌঁছোতে বেশ অনেকগুলি সিঁড়ি নামতে হবে। পথটি একদম গ্রামের অভ্যন্তরে, কিন্তু আজকাল অনেক পর্যটকের আনাগোনা হওয়ায় পথের দু’পাশে গ্রামের মানুষ ছোটো ছোটো দোকানে পসরা সাজিয়ে বসেছে। পেটে প্রবল খিদে আর তেষ্টা নিয়ে ব্রিজ দেখে ফেরার পথে, এই দোকানগুলো কোনো এক আদিবাসী দেবতার আশীর্বাদের মতোই মনে হল।

mawlynnong-main-entrance

সেখান থেকে সোজা এসে গাড়ি থামল মাওলিংনং গ্রামের আঙিনায়। আঙিনাই বলা উচিত মনে করছি। এটি গ্রামে প্রবেশের মুখ্য পথ। কিন্তু এখানে এসে দাঁড়ালে গাঁয়ের বধুর হাতে সযত্নে নিকনো উঠোনের মতোই অনুভূতি হয়। খিদের তাড়নায় প্রথমেই গিয়ে ঢুকেছিলাম খাসিয়া ভাতের হোটেলে। আয়োজনের আধিক্য না থাকলেও আদিবাসী রমণীর হাতের তৈরি ডাল আলুভাজা আর খুবই ঝাল ঝাল কষা মুরগির মাংস, সেই পরিবেশে অমৃতের স্বাদ নিয়ে এল।

খাওয়ার পর ঘুরে ঘুরে দেখা পরিচ্ছন্ন গ্রামের অলিগলি। সত্যিই পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি এই গ্রাম। ঐশ্বর্যের দেখনদারি নেই, আবার দারিদ্রের মলিনতাও নেই। বিত্তের কম বেশি নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু ভারতের এই প্রান্তিক রাজ্যের তস্য সুদুর প্রান্তিক এই গ্রামের মানুষজন তাদের মনের উৎকর্ষ দিয়ে এ সব তুচ্ছ্ব পার্থিব তারতম্যকে অতিক্রম করতে পেরেছে। এদেরকেই না আমরা তথাকথিত শহুরে দৃষ্টি দিয়ে জংলি হিসেবে দেখি। কিন্তু সভ্যতার যে পাঠ এখানে এসে চাক্ষুষ করলাম, তার শিক্ষাটুকু যাতে মনের মাঝে অমলিন রাখতে পারি সেই প্রার্থনাই মনে মনে জানালাম। আর এই ছোট্ট খাসিয়া গ্রামটির আতিথেয়তায় (হোম স্টে-তে) এক রাত থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

 

mawlynnong-village

বিকেলে ঘুরে দেখলাম ‘ব্যালেন্সিং রক’ আর ‘রিওওয়াই’ গ্রামের কাছে ট্রি হাউস থেকে নীচের বাংলাদেশের সমতলভূমি।

balancing-rock

পর দিন ভোরে উঠে যাত্রা শুরু। সীমানার আরও কাছাকাছি থাকা ‘ডাওকি’-র দিকে। ওখানে আছে ‘উমংগোট’ নদী। ‘এ নদী এমন নদী, জল চাও একটু যদি…’, না না, শুধু মাত্র উষ্ণ বালু দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এ নদীর টলটলে এবং আক্ষরিক অর্থে নীল রঙের জল আর চরের সোনালি বালুকাবেলা আপনাকে এক বার অন্তত যে কোনো পাশ্চাত্য দেশের ছবি থাকা পোস্টকার্ডের কথা মনে করিয়ে দেবে। আর সব চেয়ে বড়ো কথা হল এত স্বচ্ছ আর পরিষ্কার এর জল যে দিনের কোনো কোনো সময় সূর্যের আলো পড়লে তলা পর্যন্ত দেখা যায়।

আর এর বর্ণনা করার জন্য সেই চিরপরিচিত কথাটি বলা ছাড়া উপায় নেই, তা  হল, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এই নদীতে নৌকা বিহার করার লোভ সংবরণ করা কঠিন। আর নদীর ঘাটের কাছে নৌকা যখন বাঁধাই আছে তখন পাড়ে বসে তার ভাসা না দেখে, জয় মা বলে উঠে পড়াই ভালো।

নীচে স্বচ্ছ নীল জল, ওপরে নীল আকাশে মেলা মেঘের ভেলা, দুই পারে ঘন সবুজ পাহাড়ের পাদদেশ আর তার সামনে সোনালি বালুচর। এ রকম স্বপ্নিল বাস্তবের মুখোমুখি হওয়া, জীবনে একাধিকবার সম্ভব কি? এ কথা ভাবতে ভাবতেই ফিরে যাওয়ার রাস্তা ধরলাম। মনে মনে ঠিক করেছি সুযোগ পেলেই আবার আসিব ফিরে।

dowki-umngot-river

ফেরার পথে ড্রাইভারের সঙ্গে এ-কথা ও-কথা আলোচনা করছিলাম। সে স্থানীয় ছেলে, তাই জিজ্ঞেস করলাম, এই যে এত লোক তোমাদের পরিচ্ছন্নতম গ্রাম দেখতে আসে, কেমন লাগে?

উত্তরে সে উল্টো বলল, ম্যাডাম কে যে কেন, এই গ্রামের এমন নাম দিল, কে জানে? উত্তর শুনে চমকে উঠলাম। এ যেন এক ইউরেকা মোমেন্ট। শুধু মাওলিংনং কেন, এই এলাকার সমস্ত গ্রামই একই রকম পরিচ্ছন্ন। সে ভাবে দেখতে গেলে সমস্ত মেঘালয়, বিশেষত ইস্ট খাসি হিলসকে অনায়াসেই দেশের পরিচ্ছন্নতম জেলার মর্যাদা দেওয়া যায়। সত্যিই তো উত্তরপূর্বের বাসিন্দা হয়ে আমি কী করে ভুলে গেলাম, পরিচ্ছন্নতার মাপকাঠিতে খাসিয়া জাতির সুনাম বহু প্রাচীন।

village

এ সব কথা মনে আসতেই আরও নিখুঁত ভাবে চার পাশে নজর রাখতে রাখতে ফিরছিলাম শিলং শহরের দিকে। মনে পড়ল, আরে এক মাতৃতান্ত্রিক সমাজের দেশে আছি আমি, আর তাই বোধহয় এদের পরিষ্কার আর বড়ো হৃদয়, সুসভ্য আচার-ব্যবহার, অহেতুক অহংবোধের অভাব, শ্রমের সমবণ্টনের মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ তাদের এই পরিচ্ছন্ন দেশ। স্বচ্ছ ভারত অভিযানের উৎকৃষ্ট রোল মডেল হতে পারে এই মেঘের আলয়।

ছবি: লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here