Search

কুকুছিনার কাহিনি : জীবন্ত মহাকাব্য

কুকুছিনার কাহিনি : জীবন্ত মহাকাব্য

sumitraসুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

দ্বারাহাট থেকে আট কিলোমিটার দূরে ধুধৌলিতে একটি সরকারি অতিথিশালা একা একা দাঁড়িয়ে আছে পুজো-না-পাওয়া কার্তিক ঠাকুরের মতো মুখ ম্লান করে। এই নিঃসঙ্গ অতিথিনিবাসে এক দিন বাতি জ্বালালে মন্দ হয় না। কুকুছিনা থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে দুনা গিরিমাতার মন্দির। রাস্তা থেকে অনেক উঁচুতে, প্রায় পাঁচশো সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হবে। দুনা গিরিমার মাহাত্ম্য এখানকার যে কোনো মানুষের কথায় ও আবেগে অনুভব করতে পারবেন। দেব-দেবীতে ভক্তি, বিশ্বাস যাঁদের নেই তাঁরাও যদি পাঁচশো সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠেন তা হলে পরিশ্রম বিফলে যাবে না। প্রথমত, উঁচু থেকে প্রকৃতিকে দেখার অভিজ্ঞতা ঈশ্বরদর্শনের মতোই দুর্লভ আর দ্বিতীয়ত, এই মন্দির-লাগোয়া হলঘরে সারা দিন ধরে চলছে ভাণ্ডারা। আপনি যাওয়ামাত্র এখানকার সেবকরা আপনাকে যত্ন করে খাওয়াবে গরম পুরি, সবজি ও হালুয়া। বিনিময়ে কোনো অনুদান দেওয়া বা না-দেওয়া আপনার মর্জি।

9

দুনাগিরি মন্দিরদর্শনের ইচ্ছা থাকলে কুকুছিনায় থাকাকালীন এক দিন ঘুরে যাওয়াই ঠিক হবে। নীচ থেকে ওপর পর্যন্ত নানা মাপের শ’য়ে শ’য়ে ঘণ্টা বাঁধা। তারা আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। আগেই বলেছি কুকুছিনাতে গাড়ির রাস্তা শেষ। অর্থাৎ আপনার জিপে যাত্রাও সমাপ্ত আর ঠিক এখানেই আপনি পাবেন জোশিজিদের রেস্টুরেন্ট ও চায়ের দোকান তথা বসতবাড়ি। এ ছাড়াও গেস্টহাউজ, মেডিটেশন রুম আর কটেজ আরও কত কী। জোশি রেস্টুরেন্টের মালিক, রাঁধুনি, পরিচারক, মুদিদোকানের হিসাবরক্ষক ও সেই সঙ্গে আরও অনেক কিছু বছর পঞ্চাশের গিরিশ জোশি। জিপ থামামাত্রই তিনি আপনার দিকে এগিয়ে আসবেন উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে। যাঁরা একাধিক বার কুকুছিনা গেছেন, তাঁরা জানেন এই ঘটনার ব্যতিক্রম হয় না কখনও। অতিথির পরিচর্যায় আর দেখভালের সময় কারও কোনো আবদার পালনের ক্ষেত্রে গিরিশজি না বলেন না। তাঁর মুখে একটা কথাই বার বার শুনতে পাবেন – “হো জায়েগা জি, হো জায়েগা”।

কুকুছিনাতে অবস্থানের একমাত্র জায়গা জোশিদের গেস্টহাউজ। গেস্টহাউজের ঘর বারান্দাগুলো মোটামুটি আরামপ্রদ। এখানকার ঘরগুলো বাস্তুশিল্প ভাবনায় নির্মিত, যাকে বলে ‘ইকোফ্রেন্ডলি’। আছে গোটা তিনেক বিদেশি ধাঁচের কটেজও। বছরের যে সময়েই আপনি কুকুছিনাতে আসবেন দেখতে পাবেন হিমালয়ের রহস্য ও আধ্যাত্মিকতার টানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে অতিথি এখানে হাজির। গেস্টহাউজে আছে বিরাট একটি প্রার্থনাকক্ষ বা মেডিটেশন রুম। নির্দিষ্ট কোনো দেব-দেবীর পুজো না হলেও মহাবতার বাবাজির কাল্পনিক চিত্র ও সেই সঙ্গে বাবাজির শিষ্য আর তাঁদের শিষ্যদের ছবিও আছে এখানে। আছেন যিশু খ্রিস্টও।

4

এ বার বাবাজির প্রসঙ্গে আসা যাক। এখানকার মানুষদের বিশ্বাস অনুযায়ী মহাবতার যোগী প্রাচীন ক্রিয়াযোগের কঠিন চর্চার মধ্য দিয়ে অবিনশ্বর শরীর ধারণ করেছেন। আড়াই হাজার বছর ধরে তিনি এই জঙ্গল পর্বত গুহায় অবস্থান করছেন। তাঁর কৃপা ও আশীর্বাদ পেলে ভক্তরা কখনও কখনও দর্শন পেয়েছেন বলে শোনা গেছে। কুকুছিনায় জোশিদের অতিথিনিবাসের ঠিক উলটো দিকের পাহাড়ে রয়েছে ‘বাবাজি কা গুহা’। সেই গুহায় পাহাড়ি ঝরনা ও জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাথুরে সিঁড়ি ভেঙে তিন কিলোমিটার ওঠানামা করতে হবে। যাঁরা ট্রেক করতে ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে আদর্শ। প্রায় ঘণ্টা তিনেক সময়, শুকনো খাবার আর জল সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। মাঝ রাস্তায় হঠাৎ আবির্ভূত হবে একটি পাহাড়ি কুকুর। যে আপনাকে পথ দেখাতে দেখাতে পৌঁছে দেবে বাবাজির গুহার কাছাকাছি। তার পর অদৃশ্য হবে। এই মহাভারতীয় অত্যাশ্চর্য দর্শনের জন্য কুকুছিনায় এসে আপনাকে বাবাজি কা গুহা দর্শনে যেতেই হবে। গুহার ভেতরে এখন অবশ্য আর যাওয়া যায় না। পাঁচিল তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। লোকমুখে শোনা যায়, এই গুহার ভেতরেই নাকি পাণ্ডবদের যুদ্ধাস্ত্র রাখা আছে। বাবাজির গুহা যে পাহাড়ে তারই মাথায় রয়েছে মহাবতার বাবার শিষ্য বলবন্ত গিরির আশ্রম – পাণ্ডব খোলি। এখন আশ্রমের দায়িত্বে বলবন্ত গিরির শিষ্য রাম সিং। পাণ্ডব খোলির শিখরে উঠতে হবে হাঁটা পথেই। কুকুছিনা থেকে সময় লাগবে আড়াই ঘণ্টার মতো। রাত্রিবাসের বন্দোবস্ত আছে। আবার সকালে উঠে বিকেলেও নেমে আসা যায়। আপনি গেলেই আপনাকে মশলা-দেওয়া উষ্ণ চা পান করাবেন রাম সিং। রাত্রিবাস করলে খাওয়াবেন পুরি-সবজি, পুদিনার চাটনি, গরম খিচুড়ি। পাণ্ডব খোলিতে ঠান্ডা কুকুছিনার থেকে অনেক বেশি, তাই তৈরি হয়ে যেতে হবে। পথে বা জোশিজির চায়ের দোকানে হঠাৎ দেখা হয়ে যেতে পারে ‘রাশিয়ান বাবা’-র সঙ্গে। সুদূর রাশিয়া থেকে এ দেশে এসে গেরুয়া ধারণ করেন। এই বাবা পাহাড়ে জঙ্গলে থাকেন। কথা বলেন চোস্ত হিন্দি এমনকি গাড়োয়ালিতেও। আরও অনেকে আছেন। ফ্রেঞ্চ বাবা, চাইনিজ বাবা – ঘুরে বেড়াচ্ছেন অথবা সাধনা করছেন এই অঞ্চলে। দলে দলে বিদেশিনিরা আসছেন ‘ক্রিয়াযোগ’-এর চর্চা করতে কুকুছিনায়। নিন্দুকেরা অবশ্য বলেন, অমূল্য পাহাড়ি গাছগাছড়া, জরিবুটি হাতাতে।

13

শ্বাস-প্রশ্বাসের বিশেষ প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নিজের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়, এক কথায় সেটাই ক্রিয়াযোগ। মহাবতার বাবার কাছ থেকে তাঁর শিষ্যরা এই বিদ্যা প্রাপ্ত হয়েছেন। আধুনিক কালে যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের মাধ্যমে মানুষ পরিচিত হয়েছেন ‘ক্রিয়াযোগ’ শব্দটির সঙ্গে। অতি সাম্প্রতিককালে মিডিয়ার সৌজন্যে বিষয়টা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। নতুন প্রজন্ম অন্য রকম কিছুর স্বাদ নিয়ে একঘেয়ে বৈচিত্রহীন পেশাগত জীবন থেকে সাময়িক বদল চাইতে ছুটে আসছেন পাহাড়ে। ক্রিয়াযোগের টানে। বাড়ছে আধ্যাত্ম টুরিজম। সংস্থান হচ্ছে স্থানীয় মানুষের ডাল-রুটিরও। মন্দ কী? কেউ যদি এই সব আধ্যাত্মিকতায় আগ্রহী না হন, তা হলেও কুকুছিনায় এসে প্রশান্তি অনুভব করবেন দু’চোখ ভরে যাওয়া প্রাকৃতিক মাধুর্যে, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের রক্তিম আভায় স্নান করতে করতে। অর্থাৎ নির্জন পাহাড়ি গ্রামে নিজের পদধ্বনি নিজের কানে শুনে। আপনার যদি সাহিত্য বা সৃজনে অভ্যাস থাকে তা হলে জোশিজির বারান্দায় দু’ এক দিন বসে থাকলেই মনের মধ্যে জমে থাকা আইডিয়াগুলো লেখায় অথবা রেখায় অবয়ব পেতে শুরু করবে।

15

যদি পরিচিত হতে চান অপরিচিতদের সঙ্গে, তবে কিছুটা সময় আর এক কাপ চা নিয়ে বসে থাকুন গিরিশজির দোকানে। নেপালের গ্রাম থেকে সীমান্ত ডিঙিয়ে প্রায় পেটচুক্তিতে মজুরের কাজ ও খেতি করতে আসা শ্রমিক, পাহাড়ে পাহড়ে গরু-মোষ চরানো গৃহবধূ, হলদুয়ানি থেকে আসা বাসের কনডাক্টার, রাস্তা তৈরির ঠিকাদারের অস্থায়ী কর্মী, আঙ্কেল চিপসের একটা প্যাকেট হাতে পেলে পরশপাথর প্রাপ্তির খুশিতে ডগমগ হয়ে ওঠা সদ্য-স্কুল-যেতে-শুরু-করা গ্রামের বালক ও অবশ্যই গিরিশজি – একটু ভাব জমলেই দেখবেন প্রত্যেকেই আপনার সামনে মেলে ধরছে পাহাড়ি জনজীবনের আধুনিক মহাকাব্য। পাহাড়ে রোজগারের অভাব, শিক্ষা-স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ভালো নয়। নতুন প্রজন্ম থাকতে চায় না এবং সমস্যা আরও অনেক। দেশের অন্যান্য অঙ্গের মতোই। তবু সবার বুকভরা আনন্দ, মুখভরা হাসি। এ কি বাবাজির লীলা, না কি প্রাকৃতিক বিচিত্র খেলা! দেখতে হলে দু’ চার দিন তো ঘুরে যান কুকুছিনায়। জেনে ভালো লাগবে শুধু আপনিই নন, দক্ষিণী মহাতারকা রজনীকান্তও ঘুরে গেছেন স্বয়ং। তৈরি হয়েছে বাবাজি কা গুহা নিয়ে চলচ্চিত্রও। তা হলে আর দেরি কেন?

(শেষ)

ছবি: লেখক

যোগাযোগ – শ্রী গিরিশ জোশি। কুকুছিনা, আলমোড়া, উত্তরাখণ্ড। (০)৯৪১১৩১৮৫৪০।

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন