khabor online most powerful bengali news

সপ্তাহান্তে চলুন জয়রামবাটি-কামারপুকুর

smita dasস্মিতা দাস

বিছানায় শুয়ে ঘুম চোখ খুলে চিন্তা আর চাক্ষুষে কোনো মিল পেলাম না। চিন্তায় ভেসে বেড়াচ্ছে শীতের ভোর সাড়ে চারটে, মঙ্গল আরতির সেই তিরতির করে জ্বলা আগুন শিখা।

তখন ঘড়িতে ভোর চারটে পনেরো। সবাই মিলে হুড়োহুড়ি করে কোনো রকমে গরম জামা গায়ে চাপিয়ে মায়ের ঘরে যাওয়ার ধুম পড়ে গেল। পুকুরপাড় আর বাগানের মাঝের রাস্তাটা দিয়ে যে যার মতো ছুটছি। ‘মায়ের ঘরের দরজা বোধহয় এখনও খোলেনি’। না, ভাবনাটা ভুল। দরজা একটু আগেই খুলে গেছে। ভেতরে অনেকে বসেও পড়েছেন। ঘরের বাইরে জুতো খুলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে ভেতরে ঢুকে নিঃশব্দে বসে পড়লাম সবার শেষে প্রায় দরজার মুখে। আস্তে আস্তে শুরু হল মায়ের মঙ্গল আরতি। একটা অদ্ভুত অনুভূতির শুরু বোধ হয় সেখান থেকেই।

ভেবেছিলাম পাঁচ মিনিটের তো ব্যাপার, মঙ্গলারতি দেখে এসে ঠিক ঘুমিয়ে পড়ব। বাকি ঘুমটা পুষিয়ে নেব। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি, ফেরার সময় ঘুম নয়, মনশ্চক্ষুতে সেই হাতের অমোঘ নড়াচড়াটা সম্বল করে ফিরতে হবে আমায়।

sarada-exhibition
সারদামায়ের জন্মকাহিনির প্রদর্শনী।

মায়ের ঘরে বসে আছি, শুরু হল আরতি। একটাই ঘণ্টা বাজছে, কিন্তু এমন তার ছন্দ আর ব্যাপ্তি যা ঘরের বাইরে পৌঁছচ্ছে না। কিন্তু ঘরের ভেতরেই মনকে কোথায় যেন পাঠিয়ে দিচ্ছে। সঙ্গে একটা বড়ো কাঁসরও বাজছে। বাজছে অদ্ভুত ভাবে। জোরে নয়, ভেতরে ভেতরে গুমরে ওঠার মতো, কেমন একটা অদ্ভুত ভারী স্বরে যেন ঘণ্টার সেই শব্দকে অনুসরণ করতে নির্দেশ দিচ্ছে। বুঝতে পারছি কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতির অনুরণন আমার ভেতরে ভেতরে ঘটে চলেছে। অল্প আলোয় বসে থাকা মায়ের সামনে বড়ো দরজা হাট করে খোলা। যেন কোলে টেনে নেওয়ার জন্য মা কোল পেতে বসে আছে। আর হাট করে ভেতরে খোলা দরজার আড়াল থেকে ত্যাগের গেরুয়া পরা সুদৃশ্য হাত কর্তরী (নাচের একটা বিশেষ মুদ্রা) মুদ্রায়, আরতির এক বিশেষ নকশায় এক ভাবে নড়ে চলেছে। মুদ্রার মাঝে ধরা রয়েছে একটা সামান্য লম্বা প্রদীপ, যাতে একটা মাত্র শিখা জ্বলছে তিরতির করে। সেই শিখাও যেন ও-ই তালে তালেই নড়ছে আর বলছে, ‘ওই শাশ্বতকে স্পর্শ করেছে’। ‘তুমিও এসো’। আর হাতের ওই নড়াচড়া যেন আবাহন করছে নতুন মনের। দিক নির্দেশ করছে কোন পথে যেতে হবে। বেশিক্ষণ চলল না পুরো ঘটনাটা। মাত্র পাঁচ মিনিট। চারপাশে আর কোনো আলাদা শব্দ নেই। এমনকি পাশের এতগুলো মানুষেরও কোনো অস্তিত্ব অনুভব করা গেল না এই সময়টা জুড়ে। সামান্য সময়, কিন্তু যেন মনে হচ্ছিল কত লম্বা পথ যেন ওই শব্দে শিখায় অতিক্রম করা হয়ে গেছে। কত হাজার মাইল যেন হেঁটে চলে গেছি কোন অজানার দৃশ্যমান উদ্দেশে। তার পর আস্তে আস্তে থেমে গেল সব। নড়াচড়া বন্ধ হল শব্দ-শিখার। চারপাশ আবার সচল হল। তখন যে সবে ৪.৩৫। চার দিকের অন্ধকার এখনও কাটেনি। আমিও ফিরলাম আরতির সেই ‘শব্দ-শিখার গতিময়’ চলাটাকে সঙ্গী করে। মায়ের বাড়ির ভাড়াঘরের বিছানায় শুয়ে আমি, তাও সেই শব্দ যেন আমাকে ডেকে নিয়ে চলেছে।

ramkrishna-mancha
শিব সেজে অভিনয় করতে গিয়ে ঠাকুরের ভাবসমাধি হয়েছিল এই নাট্যমঞ্চে। 

আস্তে আস্তে আলো ফুটল জয়রামবাটির পরিবেশে। তাড়াতাড়ি তৈরি হতে হবে।  ব্রেকফাস্ট সকাল সাড়ে ছটায়। তার পরই বেরিয়ে পড়ব। আসবে ভ্যান। যাব কামারপুকুরে বাবার বাড়ি দেখতে।

কামারপুকুরে পেয়ে গেলাম এক মহিলা গাইডকে, ঘুরে ঘুরে সব দেখালেন। কোথায় ঠাকুরের মা ছেলের জন্য হত্যে দিয়ে পড়েছিলেন, কোথায় ঠাকুর ছেলেবেলায় শিব সেজে যাত্রাপালায় অভিনয় করতে গিয়ে সমাধিস্থ হয়েছিলেন, কোথায় পাইনদের বাড়ির সংস্কারের বেড়া ভেঙে সে বাড়ির মেয়েদের বাইরের আলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, পাইনদের কোন বাড়িতে মেয়ে সেজে ঠাকুর মেয়েমহলে লীলা করেছেন, কোন পুকুরে মা ‘গাত্র ভিজিয়ে’ স্নান করেছেন – সবই দেখলাম এক এক করে। আর বিভোর হয়ে গেলাম। কেমন যেন ২০১৬ সাল থেকে প্রায় পৌনে দুশো বছর পিছিয়ে গেলাম। ওখানে যেন আমার জন্য আরও চমক অপেক্ষা করছিল। যেখানে ঠাকুর ‘পাঠলীলা’ করেছেন সেই পাঠশালায় নাকি এখনও সেই একই খুঁটি, একই কড়িবরগা, একই মেঝে রয়েছে। তাতে যেন তাঁর স্পর্শ অনুভব করলাম। এর পর সেই ঠেঁকিশাল। এখানেই ঠাকুরের জন্ম। সেই জায়গাটাতে এখন ঠাকুরের মূল মন্দির তৈরি করা হয়েছে। তবে রয়ে গেছে বাসগৃহ, বৈঠকখানা, ঠাকুর ঘর সবই। দেখার পালা তখনকার মতো শেষ। এখন এ বার মায়ের বাড়ি ফেরার পালা। তিনি যে খাবারের থালা সাজিয়ে অপেক্ষা করছেন ক্ষুধার্ত সন্ত্বানদের জন্য। চড়লাম ভ্যানে। ফেরার পথে কিনলাম সাদা বোঁদে। কামারপুকুরের বিখ্যাত সাদা বোঁদে।

lahabari
লাহা বাড়ি। 

মায়ের বাড়ি মানে, জয়রামবাটিতে সারদা মায়ের জন্মস্থান। ঠিক যে জায়গাটাতে মা জন্মেছেন সেখানেই করা মায়ের মন্দির। আর মন্দির ঘিরে তাঁর বাপের ঘরের নানা স্মৃতি। ঐতিহ্যবাহী ঘর-দুয়ার-মন্দির-পুকুর কত কী। সবই যত্নে আদরে ভক্তি শ্রদ্ধায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফুলেফুলে গাছেগাছে এক অপরূপ মনোরম পরিবেশ সেখানে।

আগের দিন সকালে আরামবাগে পৌঁছই। সেখান থেকে মারুতি ভাড়া করে জয়রামবাটি। মায়ের বাড়ি। ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক সাড়ে এগারোটায় দুপুরের খাবার। খেয়ে উঠেই বেরিয়ে পড়া মায়ের পাড়া বেড়াতে। সেখানে দিদিমা মানে সারদা মায়ের মা যে-ই ঘাটে স্নান করতেন, মায়ের স্নানের ঘাট, সেই শিবতলা যেখানে যাত্রা দেখতে গিয়ে ঠাকুর আর মায়ের দেখা হয়, সবই দেখলাম। এমনকি দেখলাম শিহড়ের সেই কিংবদন্তি স্থান, যেখানে বেল গাছতলায় মায়ের গর্ভে অলৌকিক ভাবে প্রবেশ করেছিলেন মা সারদা। দেখা হল ঠাকুরের ভাগনে হৃদের বংশধরের সঙ্গেও। অশীতিপর সেই বৃদ্ধ মানুষটি শোনালেন শ্রীরামকৃষ্ণের অনেক অলৌকিক লীলার কথাও। ভরে গেল স্মৃতির কৌটো। এক অনির্বিচনীয় অনুভূতি। 

hotye
ঠাকুরের মা হত্যে দিয়েছিলেন এই শিবমন্দিরে।

ফিরলাম মায়ের বাড়ি। সাড়ে তিনটেয় চায়ের আয়োজন। এর পর সন্ধ্যারতি, ভজন-প্রার্থনা, পাঠ শোনা। তার পর রাত সাড়ে আটটায় রাতের খাবার। খেয়ে উঠে যে যার মতো করে সময় কাটিয়ে ঘুমোতে গেল। পরের দিনের ভোরে সেই মঙ্গলারতি।  

তৃতীয় দিন ভোরে নেশার মতো টান অনুভব করলাম। ছুটলাম আরতি দেখতে।  আরও এক বার বুকে ভরে নিলাম সেই অভূতপূর্ব অনুভূতি। আরতি শেষ। অন্ধকার। ফিরলাম ঘরে। মন খারাপ। দু’টো দিন কেটে গেল। এ বার তো ফিরতে হবে।

naranarayan
নরনারায়ণ মন্দির। 

কী করে যাবেন 

হাওড়া থেকে ট্রেনে আরামবাগ স্টেশনে নেমে সেখান থেকে গাড়িতে জয়রামবাটি বা কামারপুকুর, যেখানে থাকতে চান। স্টেশনের বাইরেই গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। একটু দর দস্তুর করে ওঠাই ভালো হবে। এ ছাড়া হাওড়া বা ধর্মতলা থেকে সরকারি বা বেসরকারি বাসেও যাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে আরামবাগ বা জয়রামবাটি অথবা কামারপুকুরের বাসও পাওয়া যায়। এখন বেলুড়মঠ থেকেও এই দু জায়গার এসি বাস চালু হয়েছে। সে ক্ষেত্রে আগে থেকে যোগাযোগ করে বুকিং করে রাখলেই ভালো।

কোথায় থাকবেন

কামারপুকুরে মিশনের গেস্ট হাউজে আর জয়রামবাটিতে মায়ের বাড়িতে থাকা যায়। এই দুই ক্ষেত্রেই আগে থেকে বুকিং করে রাখতে হয়। মায়ের বাড়িতে থাকতে হলে তিন মাস আগে থেকে বুকিং করতে হয়। এ ছাড়াও মন্দির চত্বরের ঠিক বাইরেই একাধিক হোটেল হলিডে হোম আছে। সেখানেও থাকা যেতে পারে।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন