চিরঞ্জীব পাল

নকশালবাড়ি: নকশালবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে নেমে একটু এদিক-ওদিক তাকালেই চোখে পড়বে পোস্টার। রঙিন-সাদাকালো। কোনো পোস্টারে রয়েছে চারু মজুমদারের ছবি, কোথায় আবার শ্রমিক-কৃষকের কাস্তে-হাতুড়ি নিয়ে উঁচিয়ে থাকা হাত। কোনো পোস্টারে রয়েছে শুধুই স্লোগান।

এ বছর নকশালবাড়ি ‘অভ্যুথান’-এর ৫০ বছর। ১৯৬৭ সালের ২৪ মে নকশালবাড়ি থেকে দু’ কিলোমিটার দূরে ঝড়ুজোতে জোতদার-জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষক-বিদ্রোহ রুখতে প্রবেশ করে বিশাল পুলিশবাহিনী। স্থানীয় গ্রামবাসী ও কৃষক এবং আশপাশের চা-বাগান থেকে আসা শ্রমিকদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে পুলিশ। শুরু হয় হয় খণ্ডযুদ্ধ। মারা যান সাব-ইন্সপেক্টর সোনাম ওয়াংদি এবং আহত হন বেশ কয়েক জন পুলিশ। পরের দিন অর্থাৎ ২৫মে ফের নকশালবাড়ি থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে প্রসাদুজোতের কাছে জমায়েত হওয়া নিরস্ত্র মহিলাদের উপর শিলিগুড়ি এসডিও-র নেতৃত্বে গুলি চালায় পুলিশ। সে সময় রাজ্যে অজয় মুখার্জির মুখ্যমন্ত্রিত্বে ক্ষমতাসীন যুক্তফ্রন্ট সরকার, যার পুলিশমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। পুলিশের গুলিতে মারা যান ২ শিশু-সহ ১১ জন। তার পর বাকিটা ইতিহাস।

পোস্টার পড়েছে নকশালবাড়িতে
বিজ্ঞাপণ

এই ঘটনার পর থেকে ২৪ মে নকশালবাড়ি দিবস এবং ২৫ মে শহিদ দিবস হিসাবে পালন করে আসে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী দলগুলি। এ বছর পঞ্চাশে পড়ল নকশালবাড়ির ‘অভ্যুত্থান’। স্বাভাবিক ভাবে দিন দু’টি পালনেও বাড়তি উদ্যোগ থাকবেই। ‘বহুধা বিভক্ত’ মাক্সর্বাদী-লেনিনবাদী দলগুলি কেউ যৌথ ভাবে, কেউ আবার একক ভাবে নকশালবাড়ির পঞ্চাশ বছর পালন করছে। কেউ শিলিগুড়িতে, কেউ আবার নকশালবাড়িতে। তারই পোস্টার পড়েছে গোটা নকশালবাড়ি জুড়ে। শিলিগুড়িতেও।

‘লাঙল যার জমি তার’ — তেভাগা-তেলেঙ্গানার এই স্লোগান ছিল নকশালবাড়িরও। জোতাদার-জমিদারদের অত্যাচার এবং সিলিং-বহির্ভূত জমি দখলের আন্দোলনই ছিল নকশালবাড়ির আন্দোলন। আন্দোলন করে, লড়াই করে জোতদার-জমিদারদের জমি দখলও নিয়েছিলেন কৃষকরা। তার পর পঞ্চাশটা বছর কেটে গিয়েছে। নকশালবাড়ির পথ ভুল কি ঠিক তা নিয়ে বিস্তর তর্ক হয়েছে, হবেও। কিন্তু জোতদার-জমিদারদের হাত থেকে ‘দখল’ নেওয়া জমি কি আজও কৃষকের হাতে আছে ? মূলত এই প্রশ্ন নিয়েই হাজির হয়েছিলাম নকশালবাড়িতে।

২৪ মে কৃষক আন্দোলনের যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলাম নবতিপর সেই খোকন মজুমদারের সঙ্গে। অশক্ত শরীর। কথা জড়িয়ে যায়। একই বিষয় নিয়ে একাধিক সাংবাদিককে একই কথা বলেছেন। তবু ক্লান্তি নেই। প্রশ্নটা করেছিলাম তাঁকেই। একটু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, কৃষকদের হাতে কোথায় জমি, সব তো চলে যাচ্ছে প্রোমোটারদের হাতে। কৃষকের ছেলেরা আর চাষ করে না। এই সাক্ষাৎকার নেওয়ার দু’দিন পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন খোকন মজুমদার।

জমির হাতবদল নিয়ে আরও বিস্তারিত বললেন শেফালি বিশ্বকর্মা — পুলিশের গুলিতে নিহত বাবুলাল বিশ্বকর্মার নাতনি –- “‘দখল নেওয়া বেশির ভাগ জমিতে আর চাষ হয় না। মণিপুর, সিকিম থেকে প্রোমোটাররা এসে সেই সব জমি কিনে নিয়ে ফেলে রেখেছে”। “কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা খুদন কৃষাণের নাতি আর কৃষি কাজ করে না”, জানালেন তিনি।

নকশালবাড়ি আন্দোলনে যখন তুঙ্গে সেই সময় স্কুলে পড়তেন নাথুরাম বিশ্বাস। ১৯৬৯ সালে খাদ্য আন্দোলনের সময় স্কুলে স্ট্রাইক করেন। নাথুরামবাবুর আদি বাড়ি নদিয়ায় হলেও দাদু নকশালবাড়িতে জমি কিনে বসবাস করতে শুরু করেন। তিনি জানালেন, “জমি বিক্রি করে দেওয়ার ঢল নেমেছে গত ১০-১২ বছর থেকে। নিজের জমিতে চাষ করার বদলে কৃষকেরা জমি বেচে দিয়ে অন্যত্র কাজ করছেন।” তিনি আর জানালেন, “শুধু প্রোমোটার নয়, চা-বাগানকেও কৃষকরা জমি বিক্রি করে দিচ্ছে। সম্প্রসারণ হচ্ছে বাগানের। অনেকে আবার নিজেরাই কৃষিজমিতে চা গাছ লাগিয়ে বাগান করছেন।”

খোকন মজুমদার

নাথুরামবাবু জানালেন, “যে বাবুলাল বিশ্বকর্মা নকশালবাড়ি আন্দোলনে শহিদ হয়েছিলেন, সেই বাবুলালের গ্রামের ৭৫ শতাংশ জমি চলে গিয়েছে প্রোমোটারদের হাতে। প্রোমোটাররা প্লট করে নেপালিদের কাছে জমি বিক্রি করছেন। অবসরপ্রাপ্ত বহু সেনাকর্মী সেই জমি কিনেছেন।” তিনি জানালেন, “গ্রামের ছেলেদেরই প্রোমোটাররা দালাল হিসাবে কাজে লাগাচ্ছে। আমাদের অনেক কমরেডের ছেলেরাই এখন দালালি করে।”

তাঁর কথার প্রমাণ পেলাম হাতিঘিষা গ্রামে এসে। গ্রামবাসীদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানাতে পারলাম, নকশালবাড়ি অন্দোলনের অন্যতম নেতা জঙ্গল সাঁওতালের ছেলে উপেন কিস্কু নিজের কৃষি জমি বেচে দিয়েছেন। তিনি এখন জমির দালালি করেন। তাঁর বাড়ির আশপাশের জমিতে চাষের চিহ্নমাত্র নেই। অধিকাংশ জমি প্লট করে বিক্রি হয়ে গিয়েছে। আমরা যখন জঙ্গল সাঁওতালের বাড়ির লাগোয়া কানু সান্যালের পার্টি অফিসে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, তখন দেখলাম বাইকে চাপিয়ে এক প্রোমোটারকে নিয়ে জমি দেখাতে নিয়ে যাচ্ছেন এক দালাল।

নাথুরাম বিশ্বাস

বাস্তবটা যে এমনটাই তা স্বীকার করে নিলেন শান্তি মুণ্ডা। ২৫মে এই শান্তিই কাঁখে ১৫ দিনের বাচ্চাকে বেঁধে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। “আমরা তখন জমিদখলের আন্দোলন করেছিলাম। এখন জমি ধরে রাখার আন্দোলন করতে হবে”, বলে মন্তব্য তাঁর।

“কিন্তু আন্দোলন করবে কে? আমাদের কমরেডের ছেলেরাই তো এখন জমির দালালি করে। জমির দালালি করে এককালীন টাকা হাতে এসে যায়। তার পর বাইক কিনে দেদার আনন্দ-ফুর্তি”, বললেন নাথুরাম বিশ্বাস।

এলাকায় খেতমজুরও মেলা ভার। সে সময় যে সব খেতমজুর আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের পরিবারের কেউই আর খেতমজুরের কাজ করেন না। অধিকাংশই নেপাল বা অন্যত্র মিস্ত্রি-মজুরের কাজ করেন। কারণ খেতমজুরের থেকে অন্যত্র মিস্ত্রি-মজুরের কাজ করে আয় অনেক বেশি।  সেই সময় যে দু’জন শিশু পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল তাদের একজনের পরিবার খেতমজুরের কাজ করত। আমরা দেখা করতে চেয়েছিলাম তার পরিবারের সঙ্গে। এক গ্রামবাসী জানালেন তাদের পাওয়া যাবে না। কারণ পরিবারের সবাই নেপালে কাজ করতে চলে গিয়েছেন।

প্লট হয়ে যাওয়া জমি

কেন জমি বেচে দিচ্ছেন কৃষকরা?

“‘নকশালবাড়ি বা তার আশেপাশের জমি দক্ষিণবঙ্গের জমির মতো উর্ব্বর নয়। এক ফসলি। নকশালবাড়ি আন্দোলনের পর কৃষকেরা জমি হাতে পেয়েছিলেন। কিন্তু জমি থেকে আয় বাড়েনি। কৃষির উন্নতির জন্য কৃষকের নিজস্ব কোনো ভাবনাও ছিল না। ফলে দিনের পর দিন কৃষি কাজ থেকে আগ্রহ হারিয়েছেন কৃষকেরা,” জানালেন নাথুরাম বিশ্বাস। তা ছাড়া, এলাকায় সেচব্যবস্থারও কোনো উন্নতি হয়নি। এখনও কৃষককে সেচের জলের জন্য প্রকৃতির উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। ফলে চাষের খরচ যে হারে বেড়েছে সেই তুলনায় আয় বাড়েনি, মত নাথুরামবাবুর।

চাষ নেই। খাঁ খাঁ করছে মাঠ

তিনি জানালেন, “সামজিক ভাবেও কৃষকের ভাবনা-চিন্তার বদল হয়েছে। আগে কৃষক ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাত না। এখন করাচ্ছে। তাই জমি বেচে দিয়ে যে টাকা আসছে তার একটা অংশ স্কুলে পড়ানোর জন্য খরচ করছে।” এই রকমই একটা খরচের হিসাব হিসাব পেলাম হাতিঘিষার এক টোটো চালকের কাছ থেকে। নাম শিবলাল সিংহ। দাদু জোতদার ছিলেন। ৩৫ বিঘা জমি ছিল। বতর্মানে যে জমি হাতে রয়েছে তার কিছু অংশ কৃষিকাজের জন্য রেখে দিয়েছেন। বাকি ব্যাঙ্কের কাছে বন্ধক রেখে আশি হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। সেই আশি হাজারের মধ্যে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে একটি সেকেন্ড হ্যান্ড টোটো গাড়ি কিনেছেন। গ্রামে একটি ছোটো মুদি দোকান আছে। ২০ হাজার টাকা দিয়ে দোকানে মাল তুলেছেন। বাকি কুড়ি হাজার খরচ করেছেন মেয়ের পড়াশোনার জন্য। ভর্তি করেছেন স্থানীয় ইংরাজি মাধ্যম স্কুলে।

প্রস্ততি চলছে

চাষের জমি বিক্রি করে দিয়েছেন ২৫ মে পুলিশের গুলিতে নিহত ধনেশ্বরী দেবীর ছেলে পবন সিংও। বাস্তুজমিতে পাকা বাড়ি করেছেন।  তিনি জানালেন, যেখানে সেই গুলিচালনার ঘটনা ঘটেছিল সেই প্রসাদুজোত এবং আশপাশের গ্রামের বহু কৃষক তাঁদের জমি বেচে দিয়েছেন ‘জমি মাফিয়াদের’ কাছে ।

পবন সিং-এর বাড়ি পাশে বেদি

৫০ বছর পার হয়েছে। এই পঞ্চাশ বছরে নকশালবাড়িতে বদল হয়েছে অনেক কিছুর। জমির, কৃষকের, খেতমজুরের। নকশালবাড়ির পঞ্চাশ বছরপূর্তি যাঁরা পালন করছেন, তাঁরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন সেই বদল। তবু পোস্টার বা লিফলেটে নেই সেই বদল-কথা। নেই কোনো নতুন স্লোগান। সেই পুরোনো স্লোগানে ভরা লিফলেট-পোস্টার। সেই স্লোগানের ডাক আদৌ কি পৌঁছচ্ছে নকশালবাড়ির কানে? নাকি তা শুধু স্মৃতি আকড়ে বেঁচে থাকার ‘আবেশ’ এনে দিচ্ছে? উত্তর খুঁজছে এই প্রশ্নটাই।

বিজ্ঞাপন

1 মন্তব্য

  1. ‘লাঙল যার, জ‌মি তার’ এ স্লোগান নকশালবা‌ড়ির আন্দোল‌নে ছিল এমন তথ্য প্র‌তি‌বেদক পে‌লেন কো‌থ্থে‌কে?
    নকশালপন্থীদের স্লোগান তো ‘চাষ যার, জ‌মি তার’
    ভার‌তের কৃষকসমা‌জে প্রধানত বড় কৃষক বা মাঝা‌রি কৃষকরাই ‘লাঙল’ (চা‌ষের উপকরণ অর্থে) ‘এর মা‌লিক,‌ছোট কৃষক বা ভূ‌মিহীন কৃষক বা ক্ষেতমজু‌রের তো তা কেনার সামর্থ্য নেই,ফ‌লে ‘চাষ যার, জ‌মি তার’ই নকশালবা‌ড়ির স্লোগান

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here