পরিবেশ বাঁচাতে বুধবার হাড়োয়া রোড অবরোধ করবেন ৫০ হাজার গ্রামবাসী

0
138

অর্ণব দত্ত :

ফসল বাঁচাও, মাছ বাঁচাও, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বাঁচাও। পরিবেশরক্ষার দাবিতে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ২০টিরও বেশি গ্রামের অন্তত পক্ষে ৫০ হাজার বাসিন্দা ১১ জানুয়ারি রাস্তা অবরোধ করতে চলেছেন। অবরোধ করা হবে হাড়োয়া রোড। বৃহস্পতিবার জমি ও বাস্তুতন্ত্র পরিবেশ রক্ষা কমিটির ব্যানারে রাস্তা অবরোধের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

এ দিন মানবাধিকার সংগঠনগুলি, বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট গবেষকরা ও একটি নকশালপন্থী সংগঠনে্র কর্মীরা ইতিমধ্যে আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। এপিডিআর-এর পক্ষে সুজাভ ভদ্র, সিপিআইএম এল রেড স্টারের পক্ষে শর্মিষ্ঠা চৌধুরী, বিজ্ঞানী ও সমাজকর্মীদের একাংশ এ দিন কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে ১১ জানুয়ারি রাস্তা অবরোধের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দাবি করেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পাওয়ার গ্রিড প্রকল্পের কাজ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নইলে বৃহত্তর ক্ষে্ত্রে প্রতিবাদ জানানো হবে।   

তবে ইতিমধ্যে চলা ওই আন্দোলন জব্দ করতে্ জেলা প্রশাসন নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে বলে অভিযোগ। গত নভেম্বর মাসে আন্দোলনকারীদের ভিতর থেকে গ্রামবাসী এক বৃদ্ধা, তিন জন পুরুষ এবং দুই গৃহবধূকে কাশীপুর থানার পুলিশ গ্রেফতার করে তুলে নিয়ে যায়। ধৃতদের ভিতর ছিলেন সদ্যপ্রসবা এক তরুণী বধূও। ধৃতদের ১৮ দিন জেল হয়। এর পর মানবাধিকার কর্মীদের হস্তক্ষেপে তাঁরা ছাড়া পেয়ে গ্রামে ফিরেছেন সম্প্রতি। এর পরেই গ্রামে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।

সেই সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, আন্দোলন বানচাল করতে শাসকদলের এক নেতার সাঙ্গোপাঙ্গরা ভয় দেখাচ্ছে। গ্রামে ঢোকার মুখে সম্প্রতি তারা যথেচ্ছ বোমাবাজি চালিয়েছে। ঘটনার পরেপরেই ওই নেতার বিরুদ্ধে কাশীপুর থানায় এফআইআর দায়ের করেছেন গ্রামবাসীরা। তবে পুলিশ তাঁকে ধরছে না বলে অভিযোগ।

environ-2এ দিকে হুমকি যতই বাড়ছে দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগনার অন্তর্গত খামারআউট, মাঝিভাঙা, টোনা পদ্মপুকুর, ঢিবঢিবি ইত্যাদি মোট ২০টি গ্রামের বাসিন্দারা জমি ও বাস্তুতন্ত্র পরিবেশ রক্ষা কমিটির ব্যানারে আরও বেশি বেশি করে জোটবদ্ধ হচ্ছেন। সম্প্রতি রাজ্যপালের কাছে স্মারকলিপি পেশ করতে ৮-১০ হাজার গ্রামবাসী কলকাতায় মিছিলে যোগ দেন। এর পরেও কাজ না হওয়ায় রাস্তা অবরোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জমি ও বাস্ততন্ত্র পরিবেশ রক্ষা কমিটির তরফে এ দিন জানানো হয়েছে।  

উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই গ্রামগুলিতে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই বসবাস। নবাবি আমল থেকে দুই সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থা্ন। গত কয়েকশো বছরে একটিও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা এখানে ঘটেনি। বাম আমলের শেষাশেষি এখানকার বাসিন্দারা তৃণমূলকে সমর্থন করতে শুরু করেন।

২০০৯ সালে কের্ন্দ্রীয় সরকারের পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন ঘনজনতিপূর্ণ এই এলাকায় একচি গ্রিড স্টেশন চালু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২০১১ সালে পরিবর্তনের সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন করে। এর পরে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় প্রশাসন এবং রাজ্য প্রশাসনের তরফ খেকে প্রকল্প রূপায়ণের জন্যে প্রায় ৯০ জন স্থানীয় কৃষকের কাছ থেকে ৩৯ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে জমি ও বাস্তুতন্ত্র পরিবেশ রক্ষা কমিটি। কমিটির তরফে মনিরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের ভুল বুঝিয়ে জমি নেওয়া হয়েছে। সেই সময়ে সরকার জানিয়েছিল, এলাকায় পাওয়ার স্টেশন তৈরি করা হবে। পরে দেখা যায় সরকার পাওয়ার গ্রিড স্টেশন বসাতে চাইছে। তিন ফসলি জমি, ভেড়িগুলির ওপর দিয়ে তার টানার কাজও শুরু হয়ে গিয়ে্ছে। পুলিশ প্রহরায় এখন টাওয়ার বসানোর কাজ চলছে।”

গ্রিড স্টেশন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসানো হলে তার সমূহ বিপদগুলি কী সে সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পরে গ্রামগুলির বাসিন্দারা প্রকল্প বাতিলের দাবিতে একজোট হয়ে্ছেন। এখানে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবিকা কৃষিকাজ কিংবা স্থানীয় ভেড়িগুলিতে গলদা চিংড়ির চাষ। দু’টি ক্ষেত্রই লাভদায়ক। গ্রামবাসীরা আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এখানে গ্রিড স্টেশন তৈরি হলে বিস্তীর্ণ এলাকায় তড়িৎ চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি হবে, ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের ওপর তার কু প্রভাব পড়বে। সেই সঙ্গে পালটে যাবে কৃষিজমির চরিত্রও। ভেড়িগুলি দূষণের শিকার হবে। সামগ্রিক ক্ষতির মুখে পড়বে এলাকার অর্থনীতি।

ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্সের তরফে প্রিয়ম বসু জানালেন, ইএমএফ (তড়িৎ  চুম্বকীয় ক্ষেত্র)-এর তৈরির ফলে বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক বায়ুদূষণ ঘটবে। চাষের জন্যে দরকার হয় জল, বায়ু ও আলো। স্বভাবতই চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তা ছাড়া, টাওয়ার বসাতে ভূগর্ভে গভীর খননের ফলে জলস্তরও স্বাভাবিকে্র চেয়ে অনেকটা নিচুতে নেমে যাবে। এলাকার অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্রকে বিপন্ন করে সরকার জোর করে প্রকল্পটা সাধারণ মানুষের ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। এর সঙ্গে উন্নয়নের কোনো সম্পর্ক নেই।

মাঝিভাঙা গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে বিদ্যাধরী নদী। এই নদীর জলেই প্রধানত চাষবাস হয়ে থাকে। প্রকল্প রূপায়িত হলে ট্রান্সফর্মারের বর্জ্য নদীতে পড়ে ব্যাপক ভাবে দূষিত হবে বিদ্যাধরীও।

জমি ও বাস্তুতন্ত্র পরিবেশ রক্ষা কমিটির তরফে মনিরুল ইসলাম বলেন, তাঁরা এই সরকারি প্রকল্পের বিরোধী নন। কিন্তু সেটা যেন এ রকম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় না করা হয়। কমিটির তরফে সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, স্থানীয় বিধায়ক আব্দুর রেজ্জাক মোল্লা, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের তরফে গ্রামবাসীরা এখনও কোনো আশ্বাস পাননি। মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকেও কোনও সাড়া নেই বলে অভিযোগ।

স্থানীয় মাঝিভাঙা গ্রামের কলেজছাত্রী বিলকিস খাতুন কিংবা গৃহবধূ হোসনিয়ারা বিবির মতো অনেক মেয়েই এখন আতঙ্কগ্রস্ত। কেননা আরাবুলের বাহিনী ভয় দেখাতে শুরু করেছে বলে অভিযোগ। গভীর রাত পর্যন্ত এলাকায় একতরফা বোমাবাজি চলছে।

গ্রি্ন বেঞ্চে সম্প্রতি একটি মামলা দায়ের করেছেন আন্দোলনকারীরা। ওই মামলার শুনানি আগামী ১২ জানুয়ারি। এর আগের দিন হাড়োয়া রোড অবরোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here