Search

শতবর্ষে স্মরণ করি ‘পৃথিবী আমারে চায়’-এর গায়ককে

শতবর্ষে স্মরণ করি ‘পৃথিবী আমারে চায়’-এর গায়ককে

papya_mitraপাপিয়া মিত্র :

বাবা সাইকেলে বসিয়ে স্কুলে দিয়ে এলে কী হবে, কিছুক্ষণ পরেই সেখান থেকে পালানো। তবে সেটাই শেষ নয়, বই-খাতাও কোথাও না কোখাও পড়ে থাকত। এমন এক দিন বিকেলে নাম লেখা বই-খাতা নর্দমা দিয়ে ভেসে যেতে দেখে মা বুঝতে পারেন। এই স্কুলছুট শিশুবালকই সত্য চৌধুরী। পরে যিনি একাধারে গায়ক-সুরকার ও অভিনেতা।

‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখো না বেঁধে আমায়’ গানটিই খ্যাতির শীর্ষে তুলে দেয় সত্য চৌধুরীকে। গানটির গায়কী আজও মানুষের মনে জাগরিত। তবে এই গান জনপ্রিয় হওয়ার পিছনে একা গায়ক নন, মোহিনী চৌধুরীর কথা এবং কমল দাশগুপ্তের মনছোঁয়া সুরের অবদান কিছু কম ছিল না। শিল্পীজীবনের শুরুতে কৃষ্ণচন্দ্র দে, রাইচাদ বড়াল, শচীন দেববর্মণের শিষ্য ছিলেন সত্য চৌধুরী। নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ট সান্নি্ধ্যলাভ প্রায় ঈশ্বরলাভের সমতুল। তাঁর বহু গান রেকর্ড করেছেন। ‘চীন ভারত মিলেছে’, ‘সঙ্ঘশরণতীর্থযাত্রা পথে’, ‘হে প্রবল দর্পহারী,’ ‘ভারত আজিও ভোলেনি বিরাট’, ‘তোমার আঁখির মতো’, ‘বল ভাই মাভৈ মাভৈ’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ সহ সত্য চৌধুরীর গাওয়া এমন বহু গান সেই সময় লোকের মুখে মুখে ফিরত। নজরুল অসুস্থ হওয়ার পরে তাঁর অনেক কবিতায় সত্য চৌধুরী ও কমল দাশগুপ্ত সুর দেন। সত্য চৌধুরী সকন্ঠে স্মরণীয় করে গিয়েছেন এমন বহু গানকে। উল্লেখযোগ্য ‘জাগো অনশন বন্দি’, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানি’, ‘নয়ন ভরা জল’। নজরুলের কবিতায় সত্য চৌধুরীর সুরে ‘হে গোবিন্দ রাখো চরণে’, ‘মোরা আর জনমে হংস মিথুন’ উল্লেখ্য। চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন ‘জয়দেব’ (১৯৪১) ছবিতে। প্রায় ১০০টি চলচ্চিত্রে তিনি গান গেয়েছেন। নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ‘রাঙ্গামাটি’ ছবিতে। ১৯৩৭-এ বেতারে বাংলা ঘোষকের কাজে যোগ দেন। কাজ করেন ১৯৭৬ পর্যন্ত। অকৃতদার শিল্পীকে জীবনসায়াহ্নে বেছে নিতে হয় স্বেচ্ছা-নির্বাসন। তখনও কিছু উৎসাহী ছাত্রছাত্রী তাঁর কাছে যেতেন।  

১৯৪৫-এ কমল দাশগুপ্তের সুরে ও প্রণব রায়ের কথায় গাইলেন ‘যেথা গান থেমে যায়, দীপ নেভে হায়’, ১৯৪৬-এ নিজের সুরে ও মোহিনী চৌধুরীর কথায় ‘জেগে আছি একা জেগে আছি কারাগারে’, ১৯৫৫-তে কমল দাশগুপ্তের সুরে ও মোহিনী চৌধুরীর কথায় সত্য গাইলেন ‘পৃথিবী আমারে চায়’। এই সব কালজয়ী গান মানুষের মনে আলোড়ন তুলেছিল। শৈশবে পেয়েছিলেন এক সাঙ্গীতিক আবহাওয়া। মায়ের মামা দিলীপকুমার রায়। মা-বাবা-কাকা-জ্যাঠা সকলেই গান করতেন। তাই ছোটো থেকেই শুনে শুনে গান রপ্ত করতেন। বাবা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতেন। বাড়িতে আসতেন ভগবানচন্দ্র সেন, যিনি পাখোয়াজ বাজাতেন। সত্য চৌধুরীর কথায়, তিনি পাখোয়াজ বাজাতে বাজাতে এতটাই মগ্ন হয়ে যেতেন যে বাবা হারমোনিয়ামে সুর ধরতেন, ভগবানচন্দ্র সেন পাখোয়াজ বাজাচ্ছেন/আপনারা যদি শুনবেন তো দয়া করে আসবেন। মায়ের খুব প্রিয় ছিল রজনীকান্ত সেনের গান।  

১৯১৮-এর ১৭ সেপ্টেম্বর, কলকাতার ৩১ নম্বর গ্রে স্ট্রিটে জন্ম হল সত্য চৌধুরীর। বাবা যতীন্দ্রমোহন চৌধুরী ছিলেন হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট। আদি নিবাস রাজশাহির মাদারিপুর গ্রাম। দেড় বছর যখন সত্যর, তখন বাবা চলে আসেন মামারবাড়ির কাছে ল্যান্সডাউন রোডে। সত্য চৌধুরীর পড়াশোনা পদ্মপুকুর ইনস্টিটিউশনে ক্লাস এইট পর্যন্ত, তার পর মিত্র ইনস্টিটিউশনে, সেখান থেকে ম্যাট্রিকুলেশন। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি ও বটানি নিয়ে স্নাতক হয়েছেন আশুতোষ কলেজ থেকে।

তাঁর জীবনের পরম সৌভাগ্য তিনি নজরুলের সান্নিধ্যে এসেছিলেন বহু বার। প্রথম আসা ১৯২৭ সালে। রাজশাহির একটি সাধারণ গ্রন্থাগারে সেক্রেটারি ছিলেন জ্যাঠামশাই অশোকচন্দ্র চৌধুরী। কলকাতায় কেনাকাটা করার জন্য তিনি প্রায়ই আসতেন। তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন সত্য। সেখান থেকে ডিএম লাইব্রেরি। সেখানেই দেখা হয় কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে।  

আশুতোষ কলেজের সহপাঠী কালীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাদা কিশোরীমোহনের বাড়িতে থাকতেন শচীন দেববর্মণ। পরে যদিও শচীনকর্তা রাজা বসন্ত রায় রোডে চলে যান। কিশোরীমোহনের রেফারেন্সে শচীন দেববর্মণের গানের স্কুল ‘সুর-মন্দিরে’ ভর্তি হন সত্য। ভর্তির সময় যে চার টাকা লেগেছিল, সেই টাকা রোজগারের মজার ঘটনা আছে। একটি দৈনিক পত্রিকায় ফোটোগ্রাফির প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পাঁচ টাকা পান। সেই টাকায় গানে ভর্তি হন। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত গান শেখেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও লঘু শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষা করেছেন দবীর খান, মেহেদী হোসেন খান ও বিষ্ণূপুরের জ্ঞান গোস্বামীর এক শিষ্য ফণীভূষণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে।

প্রথম বেতারে গান গাওয়া ১৯৩৭ সালে। তখন তিনি কলেজের নামকরা গায়ক-ছাত্র। বাবার বন্ধু সুরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সত্যকে নিয়ে গেলেন বেতারকেন্দ্রে। সেখানে অডিশনে শচীনকর্তার গান গাইলেন আর সাত দিনের মধ্যে ডাক পেয়ে গেলেন।

১৯৩৯ সালে ইউনিভারসিটি ইনস্টিটিউট হলে ইন্টার কলেজিয়েট মিঊজিক কম্পিটিশনে গায়কের পুরস্কার পান। ১৯৩৭ সালে দেবেশ বাগচী সত্য চৌধুরীকে নিয়ে যান অনুপম ঘটকের কাছে। এবং হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে প্রথম রেকর্ড বের হয় বিমল মিত্রের দুটি গান। ‘আজি শরত চাঁদের তিথিতে’ ও ‘শিউলি ঝরা অঙ্গন পথে’।

প্রতিবেশী হিসেবে মোহিনী চৌধুরীকে পেয়ে সত্য চৌধুরী নিজেকে ধন্য মনে করেছেন। অমন সহজ-সরল মানুষ ও আত্মমগ্নতা খুব একটা দেখেননি অন্য কারওর মধ্যে। নজরুল ইসলামের প্রশিক্ষণে শেষ গানের রেকর্ড বের হয় ১৯৪২-এ তিনজনের কন্ঠে। ‘সঙ্ঘশরণতীর্থযাত্রা পথে’ গেয়েছেন জগন্ময় মিত্র, প্রতিভা ঘোষ ও সত্য চৌধুরী।

শতবর্ষে পড়লেন সেই সত্য চৌধুরী। সম্প্রতি নন্দন ৩-এ ‘পৃথিবী আমারে চায়’-এর উদ্যোগে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করলেন বিশিষ্টজনেরা। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার কথা তুলে আনলেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। বেতারে এক সঙ্গে ঘোষকের কাজ করা মিহির বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করলেন। সত্য চৌধুরী সম্পর্কে আরও নানা কথা শোনালেন রেকর্ড সংগ্রাহক সুশান্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, সংস্থার চেয়ারপার্সন রত্না শূর সহ অনেকে।

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন