Search

ডাক্তারের চেম্বার থেকে: চোখের কয়েকটি সাধারণ রোগ

ডাক্তারের চেম্বার থেকে: চোখের কয়েকটি সাধারণ রোগ

ডাঃ সুগত পাল (চক্ষু বিশেষজ্ঞ)

প্রথমেই বলে রাখি আপনাকে ভয় দেখানো এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমরা বেশির ভাগ সময়েই চোখের নানান সমস্যায় বিব্রত হয়ে পড়ি। শুরু করি ঘরোয়া হাজার টোটকা। এই টোটকা কতটা কাজ করে তা বলা আমার এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই  গুলির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ফলে লাভের থেকে লোকসানের সম্ভাবনা বেশি হয়ে যায়। আমাদের আলোচনার প্রথম পর্বে আমি কিছু রোগ ও তার লক্ষণ সম্পর্কে আপনাদের ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব। পরবর্তী ক্ষেত্রে এই রোগ গুলির উপষমের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যাবে।

ছানি পড়া:

 চোখের কর্নিয়া ও আইরিসের পিছনে অবস্থিত স্বচ্ছ লেন্স বার্ধক্য জনিত কারণে এবং অন্যান্য কারণে অস্বচ্ছ হয়। এই স্বচ্ছ লেন্স অস্বচ্ছ হওয়াকেই ছানি পড়া রোগ বলে। যে সমস্ত কারণে চোখে ছানি পড়ে তা হলো-
১। বয়স জনিত কারণে
২। আঘাত জনিত কারণে
৩। ডায়াবেটিস রোগের কারণে
৪। ইউভিআইটিস রোগের কারণে
৫। অনিয়ন্ত্রিত ষ্টেরয়েড ব্যবহারের কারণে

cataract

এই রোগের লক্ষণগুলি হল

ধীরে ধীরে দৃষ্টি ক্ষমতা লোপ পাওয়া,  চশমার পাওয়ার পরিবর্তন হওয়া, আলোর চারদিকে রংধনু দেখা,  একটি জিনিসকে দুই বা ততোধিক দেখা,  দৃষ্টি সীমানায় কালো দাগ দেখা,  চড়া আলোতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসা ইত্যাদি।

দৃষ্টি শক্তি সমস্যা:

(ক) প্রেসবায়োপিয়া: এটি কোনও চোখের রোগ নয়। বয়স চল্লিশ পেরোলে চোখের গঠনগত পরিবর্তন হয়। চোখের লেন্সের স্থিতিস্থাপকতা হ্রাস পায়। ফলে কাছে দেখার জন্য লেন্সের আকার পরিবর্তনের ক্ষমতা কমে যায় এবং উক্ত বয়সে কাছের জিনিস ঝাপসা দেখায়।

(খ) মায়োপিয়া: এ ধরনের রোগীরা কাছে মোটামুটি ভালো দেখতে পারলেও দূরে ঝাপসা দেখে, তাই এদের ক্ষীণদৃষ্টি বলা হয়। অবতল লেন্স বা মাইনাস পাওয়ারের চশমা পরলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। মায়োপিয়াতে চোখের আকার বড় হওয়ার কারণে চোখের দেওয়াল পাতলা হয়ে যায়। সে জন্য সামান্য আঘাতেই চেখে অনেক মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

(গ) অ্যাসটিগমেটিজম: এটি এক ধরনের দৃষ্টি স্বল্পতা, যাতে রোগীর কর্নিয়ার যেকোনো এক দিকে পাওয়ার পরবর্তন হয় বলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়, এর কারণে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা একটি জিনিসকে দু’টি দেখা এবং মাথাব্যথা হতে পারে।

নেত্রনালী প্রদাহ:

এতে রোগে সব সময় চোখ থেকে জল পড়ে এবং চোখের কোণায় চাপ দিলে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হয়। চোখের জল যেখানে জমা থাকে তা ফুলে যায় এবং জীবাণু সংক্রমণের কারণে জ্বালা করে।  

চোখের ঘা:

চোখে কোনও কিছু ধারালো বস্তু, যেমন চুল, গাছের পাতা ইত্যাদির আঘাত লাগলে ঘা হতে পারে। এছাড়া শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টিজনিত কারনে, ভিটামিন ‘এ’-র অভাবে  আলসার হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও কোনো কারণে চোখে জীবাণুর সরাসরি সংক্রমণেও আলসার বা ঘা হতে পারে।

গ্লুকোমা:

glaucoma

এটা চোখের এমন একটি রোগ, যাতে চোখের চাপ বেড়ে গিয়ে, পেছনের স্নায়ু তার কার্যকারিতা হারায় এবং ধীরে ধীরে চোখের দৃষ্টি চলে যায়। হু এর রিপোর্ট অনুসারে গ্লুকোমা হলো অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। যেকোনো বয়সে এ রোগ হতে পারে। জন্মের সময় শিশু অস্বাভাবিক বড় চোখ নিয়ে জন্মালে, একে কনজেনিটাল গ্লুকোমা বলে। তরুণ বয়সেও হতে পারে, একে বলে জুভেনাইল গ্লুকোমা। বেশির ভাগ গ্লুকোমা রোগ ৪০ বছরের পর হয়। এদের প্রাথমিক গ্লুকোমা বলে।

ইউভিয়াইটিস:

চোখের পুষ্টি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রক্তনালী পূর্ণ একটি স্তর বা লেয়ার আছে, যাকে ইউভিয়া বা ভাসকুলার কোট বলা হয়। এই ভাসকুলার কোটের জ্বালাকে ইউভাইটিস বলা হয়। চোখে আঘাত, জীবাণুর সংক্রমন, কানেকটিভ টিস্যু বা যোজককলার রোগ ইত্যাদি কারণে এ রোগ হতে পারে।

লক্ষণ:

চোখে ব্যথা, চোখ লাল হওয়া, আলোতে না যেতে পারা, মাথাব্যথা, ঝাপসা দৃষ্টি ইত্যাদি এ রোগের লক্ষণ হতে পারে।

চক্ষুগোলকের বাইরের রোগ:

(ক) ব্লফারাইটিস: এটি হলো চোখের পাপড়িতে অবস্থিত চুলের চুলকানি, আলোতে চোখ বন্ধ হয়ে আসা, চোখে জ্বালাপোড়া করা এই রোগের লক্ষণ।  
(খ) টোসিস: এটি হলো চোখের মাংসপেশির রোগ। এতে চোখে পাতা নিচে নেমে যায়। আঘাত, স্নায়ু দুর্বলতা,বার্ধক্যজনিত কারণে এ রোগ হতে পারে।
(ঘ) মেওয়া: চোখের পাতার ভিতর ব্যথাবিহীন টিউমারের মতো ফুলে যায়।

মনে হতেই পারে চোখের রোগের ডিকশনারি নিয়ে বসেছি। মোটেই নয়। শুধুমাত্র এই  রোগগুলির সম্পর্কে আপনাকে একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। এই রকম কোনো সমস্যা দেখা দিলে দয়া করে গুরুজনদের বলা টোটকা চট করে ব্যবহার করবেন না। সোজা একজন চোখের ডাক্তারের কাছে যান, পরামর্শ নিন।

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন