Search

বাসন্তীর সেন্ট তেরেজা গির্জা মেতে উঠেছে বড়োদিনের উৎসব

বাসন্তীর সেন্ট তেরেজা গির্জা মেতে উঠেছে বড়োদিনের উৎসব

papya_mitra

পাপিয়া মিত্র :

আজ ২৪ ডিসেম্বর। আর কয়েক ঘণ্টা। তার পরেই রাত ১১টায় ভক্ত সমাগমে পূর্ণ হয়ে উঠবে গির্জা। গাওয়া হবে খ্রিস্টমাস ক্যারল। আসবে সেই পুণ্য ক্ষণ। যিশুর জন্ম মুহূর্ত। রাত ১২টায় প্রধান পুরোহিত শোনাবেন যিশুর বাণী। পাশাপাশি ৮৬তম বর্ষপূর্তিতে মেতে উঠবে বাসন্তী চার্চের দীপ। তাই সেজে উঠেছে বাসন্তীর গির্জা।       

বিশ্বায়নের আঁচ লেগেছে হোগল নদীর কোলে। শীতের রোদ গায়ে মেখে খেয়ায় চড়ার মজাটুক হারিয়ে গিয়েছে বেশ কয়েক বছর। এখন গাড়ি আপনাকে পৌঁছে দেবে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী দ্বীপে। সেই দ্বীপ এখন সেজে উঠছে যিশুর আবির্ভাব আলোয়। প্রস্তুতি তুঙ্গে ‘লিটল ফ্লাওয়ার সেন্ট তেরেজা’ তথা ‘ক্ষুদ্র পুষ্প সাধ্বী তেরেজা’র উপাসনাগৃহে।

এখন কমলা রোদে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে অথবা ভাটার সময় হাতে চটিজোড়া নিয়ে সোনাখালি থেকে হোগল নদী পার হতে হয় না। সে এক সময় ছিল, যখন নদীর ছলাৎ ছলাৎ জলে নৌকা চলত তরতরিয়ে, আবার কখনও বা হেঁটে পার হতে হয়েছে নদী। এখন নদীর ওপর সেতু ভিড়ে ভিড়, পসারিরা আসেন সার দিয়ে। ঝাঁকা-ঝুড়ি-বস্তায় পথ চলা দায়। মানুষের কোলাহলে, খাবারের গন্ধে, বাসনকোসন আর কাচের চুড়ির টুংটাং শব্দে মেতে ওঠে বাসন্তীর বিস্তৃত অঞ্চল। উৎসবে রঙিন হয় খ্রিস্টমেলা।

দক্ষিণ ২৪পরগনার ক্যানিং থেকে সোজা সেতু পৌঁছে দিচ্ছে সোনাখালি। আর সোনাখালি থেকে সেতু পৌছে যাচ্ছে বাসন্তী চার্চে। জলপথে আর যাওয়া নেই, তবে সখে মানুষ জলের স্বাদ নিতেই পারে।

basantiআজ শনিবার ২৪ ডিসেম্বর বাসন্তীর চার্চে কী হতে চলেছে তা সবিস্তার জানালেন ফাদার সুনীল।  প্রায় হাজার তিনেক ভক্ত আসবেন উপাসনাগৃহে। শুরু হবে গীতিআলেখ্য। রাত ১২টা থেকে প্রধান পুরোহিত নানা গান ও প্রার্থনার মাধ্যমে শোনাবেন প্রভু যিশুর বাণী, বোঝাবেন সারমর্ম। কখনও গানে, কখনও কথায়। ভক্তগণও করবেন নামগান। এ বারের প্রধান পুরোহিত পদে থাকছেন ফাদার ইন্দ্রজিৎ। এই অনুষ্ঠান চলবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। পরে একে অন্যকে শুভেচ্ছা বিনিময় করে ভক্তরা যে যাঁর বাড়ি ফিরে যাবেন।

পরের দিন ২৫ তারিখ কী হয়?

প্রতি বছর শিশিরধোয়া শিরশিরে হিমেল বাতাস নিয়ে আসে ২৫ ডিসেম্বরের ভোর। সকালে ক্যারল বা কীর্তনের দল বের হয় বাড়ি বাড়ি গান শোনাতে। গির্জায় ফিরে আসে দুপুরের মধ্যে। ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা বের হয় দুপুর দুটো নাগাদ। আমজনতার পায়ে পায়ে তা পৌছে যায় বাসন্তীর চৌরাস্তায়। বিশ্বের ওপর শিশু যিশু থাকেন পালকিতে। নানা প্রতীক নিয়ে চলেন ভক্ত। সঙ্গে চলে কীর্তন। মাখালপাড়া, বল্লারটোপ, কুমিরমারি, সজনেতলা ও বাসন্তী ‑ এই পাঁচ জায়গা থেকে কীর্তনদল অংশগ্রহণ করে এই শোভাযাত্রায়। বিকেল ৪টেয় ওই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। ঝড়খালি, নফরগঞ্জ, বাশিরাম, শিবরাম, মসজিদবাটি, নারায়ণতলা, গদখালি, ভাঙাখালি-সহ নানা জায়গা থেকে মানুষ আসেন এই প্রাঙ্গণে।

এ বার ফিরে যাওয়া যাক ইতিহাসের পাতায়।

১৮৭৫। ক্যাথলিক প্রিস্ট ফাদার এডমন্ড ডেলপ্লেস এস জে বাসন্তীর কবরবাড়ির কাছে একটি গির্জা প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাট স্টেশন থেকে বেশ খানিক দূরে ধনপোতা মরাপাই উপাসনালয়। ওই গির্জা থেকে বাসন্তীর গির্জায় আসা-যাওয়া করতেন ফাদার। সেই কারণে এই গির্জার দীপ কখনো জ্বলেছে, কখনো নিভেছে। ১৯৩০ সালে ফাদার পল মিসেরিক গির্জায় যে দীপ জ্বালিয়েছিলেন সেই থেকে তা আজও জ্বলে যাচ্ছে। তখন গির্জার স্থায়ী পুরোহিতপদে ছিলেন ফাদার পল মিসেরিক।

তাই বাসন্তীর গির্জার সঙ্গে মরাপাই উপাসনালয়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।

ধনপোতা লালপুল পার হয়ে দারির চক গ্রামের প্রতিটি ঘর সেজে উঠছে লাল-নীল-হলুদ কাগজের মালায়, মাতা মেরির মূর্তি শোভা পাচ্ছে কাচের শো-কেসে। ধনপোতা মরাপাই উপাসনালয়ে ধ্বনিত হচ্ছে ‘আলোর দেশে যিশু এল, আঁধার গেল ঘুচে’ বাণী। ১৮৪০ সালে কৈখালিতে প্রথম ক্যাথলিক মিশন প্রতিষ্ঠার সাড়ে তিন দশক পরে ১৮৭৫-এ ফাদার এডমন্ড ডেলপ্লেস এস জে যখন ডায়মন্ড হারবার মহকুমার এই প্রত্যন্ত গ্রামে পা রেখেছিলেন তখন সুন্দরবন সাধারণের জন্য এত সুগম ছিল না। ১৮৭৫-এ গির্জাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ফাদার এডমন্ড ডেলপ্লেস এস জে-র তত্ত্বাবধানে।  

বাসন্তী সেন্ট জেভিয়ার্স-এর শিক্ষক দীপক গায়েন জানালেন, ভক্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাসন্তীর উপাসনালয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসুবিধে হচ্ছিল। তাই আগের গির্জা ঠিক জায়গায় রেখে সামনের দিকে ফুট দশেক বাড়ানো হয়েছে। যিশুর আবির্ভাব কাহিনি নিয়ে সাজানো হয়েছে উপাসনাগৃহ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সব চেয়ে বড়ো খ্রিস্টমেলা অনুষ্ঠিত হয় এই বাসন্তীতে। এই মেলার মূল আকর্ষণ রাত ৮টা থেকে আতসবাজির খেলা। চলে ঘণ্টা দুয়েক। বহু দূরের মানুষ নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরে যান। মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই খ্রিস্টমেলা স্থায়ী হলেও এর প্রসার বেড়েছে দিনে দিনে।

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন