khabor online most powerful bengali news

পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি… যেন এক আকাশ উৎসব

papya_mitra

 

পাপিয়া মিত্র

এক ঝাঁক রঙিন কাগজের টুকরোয় আকাশ ছেয়ে। এই আকাশভরা দিনের তারারা দিনক্ষণ দেখে উদয় হয়। বছরে একবার কি দু’বার। একটা সময় ছিল যখন সরস্বতীপুজোতেও ঘুড়ি উড়তে দেখা যেত। কিন্তু এখন শুধু বিশ্বকর্মাপুজোতে ভাদ্রের আকাশ রঙিন হয়। গণেশচতুর্থীর পরে আর এক পুরুষ-দেবতার পুজো, বিশ্বকর্মাপুজো।  

এক সময় কারখানা নামক কর্মমন্দিরে এই পুজোর বিপুল আয়োজন হত। আমোদ-উল্লাস, বোনাসের মোটা অঙ্ক, বড়োসড়ো মিষ্টির প্যাকেট-সহ বাড়ির কর্তারা মনখুশি নিয়ে সংসার আলো করেছেন। আজ সে সব বেশির ভাগ জায়গাতে দুব্বোঘাস আর জঙ্গল বিস্তৃতি লাভ করেছে। হাজার হাজার মানুষের মনে এখন এই পুজো কেবল স্মৃতি। বিশ্বকর্মার আরাধনা পুরুষদের ঘিরে। শিল্পাঞ্চলের পুজো সে ভাবে দেখা হয়ে ওঠেনি বলে এলাকার রিকশাস্ট্যান্ডে, ছোটোখাটো গ্যারাজে, মেকানিকদের ডেরায় উৎসব নানা রঙে মেতে ওঠে, দেখে বড়ো ভালো লাগে। এখানে তামা-পিতলের ঝাঁ চকচকে বাসনকোসন না থাকলেও কলাপাতার আন্তরিকতায় দেবতা সন্তুষ্ট। পুরুষসকল বিপুল কর্মতৎপরতায় এগিয়ে যায় পুজোপদ্ধতির দিকে। এই পুজোতে কায়িক কর্মীর ছুটির দিন। আজকে মদ্যপানের কথা বাদ রেখে শৈশববেলার ঘুড়ির স্মৃতি গপ্পোকথায় শোনাই।

যে বার কৃষ্ণচূড়া গাছটা ভেঙে পড়ল খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল তাতাইয়ের। ওই গাছটা আর লাইটপোস্টে পেঁচিয়ে সুতোয় মাঞ্জা দিত লাটুমদাদা। সে সব দেখত উত্তরপশ্চিম ঘরের জানলা দিয়ে। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সকাল থেকে তাতাইদের তিনতলার ছাদ থেকে চলত ঘুড়ির লড়াই। ছোড়দাদু চেয়ারে বসতেন। লাটুমদাদার হেল্পিংহ্যান্ড তাতাই।

কৃষ্ণচূড়া গাছটা নেই, ঠিক কথা। মাঞ্জাও ঠিকঠাক হয়নি। দুপুর হওয়ার আগেই সব ঘুড়ি হারিয়ে বসে পড়ল লাটুম তাতাইয়ের ছোড়দাদুর কাছে, আর তাতাই বসল দাদুর কোলে। মন খারাপে দাদু-ঠাকুমারাই মুশকিল আসান।

দাদু ডুব দিলেন অতীতে। স্মৃতির ঝাঁপি উঠে আসছে…। সেই যে, যে বার কৃষ্ণচূড়া গাছটার পাশ দিয়ে পতপত করে এগিয়ে এল বামনপেড়েটা…। সে আমার কী অবস্থা! ক্লাসের ভূগোল পরীক্ষাতেও মনে হয় এত ভয় পাইনি। কেন কেন? চোখ গোল গোল করে তাতাই প্রশ্ন করে বসল। আরে অনেক কান্নাকাটি করে বাবার কাছ থেকে দু’দুটো চাপরাশ বাগিয়েছিলাম। ঘুড়ি আকাশে উঠতেই যদি ভোকাট্টা হয়ে যায়। উল্টো দিকের ছাদ থেকে তখন কাঁসর-ঘণ্টা বাজছে। কাঁসর-ঘণ্টা কেন দাদু? ঘুড়ি কেটে যাওয়া মানে সবাইকে জানিয়ে দেওয়ার আনন্দ। ঠিক যখন ভাবছি আমার চাপরাশটা বেশ পয়া, দূরের আকাশে সুতো ছেড়ে খেলছি, তখনই দেখলাম পতপত করে বামনপেড়েটা আমার ঘুড়ির ঘাড়ে পড়ল। আমার ঘুড়িটা ভাসতে ভাসতে ডাম্বেল-সাহেবদের ছাদ হয়ে কোথায় চলে গেল। তখন কী করলে? আকাশে তখন হাড়িকাট, চৌরঙ্গি, মোমবাতি, শতরঞ্জি। চোখে জল নিয়ে লাটাইয়ে সুতো গোটাচ্ছি। উঃ কী ভারী লাটাই, বাবার সেই ছোটবেলার বোমালাটাই।

এমন সময় মেজকা এসে চমকে দিল। কীরে মন খারাপ নাকি? হাতে অন্য লাটাই আর একটা বাঘা। বাঘাটাকে মাথায় ঘষে চেত্তা দিল। বললাম, ওড়াবে? মেজকা বলল, শোধ নিতে হবে না? এই বলে যেই না ওড়াল, অমনি মধুদাদের জামরুল গাছের মাথায় গোঁত খেয়ে পড়ল। কোনোক্রমে টেনেটুনে হাতে পেয়ে তাতে কান্নিক দিল। কান্নিক কি দাদু? ঘুড়ি যে দিকে হেলে যায় বুঝতে হবে সে দিকে ভার আছে। তাই তার উলটো দিকের আড়াআড়ির কাঠিতে কাগজ পেঁচিয়ে লাগিয়ে দিতে হয়। সেটাই হল কান্নিক। তারপরে মেজকার লাটাইয়ে টানা মাঞ্জা। বাঘা আকাশে উড়ল। আমার ঘুড়ির কাছে যে পড়ছে, সেই ভোকাট্টা। লাটাই আমার হাতে, মেজকা টেনে খেলছে। তখন আমার আকাশে আমিই রাজা।

আচ্ছা দাদু, তুমি এত সব জানলে কী করে? শোন, তোদের ছোটবেলার মতো আমাদের ছেলেবেলা অত ধরাবাঁধা ছিল না। আমার ছেলেবেলা উত্তর কলকাতার বলরাম ঘোষ স্ট্রিটে কেটেছে। এখন দক্ষিণ কলকাতায় থাকার ফলে দুই কলকাতার উৎসবের মজা আমার জানা। আমাদের বাড়িতে যিনি কাজের মাসি ছিলেন তাঁর একটি ছেলে ছিল আমার বয়সি। সেই বকাইকে দেখতাম বিশ্বকর্মা বা সরস্বতী পুজোর সময় সরু গলি দিয়ে লগা নিয়ে দৌড়তে। তারপর হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলত, এর মজাই আলাদা। এই দেখ, বলে বুড়ো আঙুলে আর কেড়ে আঙুলে জড়ানো মাঞ্জাসুতো দেখাত বা কোনো সময় একটা ঘুড়ি এনে বিশ্বজয়ের হাসি দিত। তারপর আবার আকাশপানে চোখ।

একবার বাবামায়ের সঙ্গে আমদাবাদে ঘুড়ির মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম। অবাক হয়ে দেখেছিলাম ঘুড়ির মেলা। ঘুড়িপোক্ত বাবার কাছে জেনেছিলাম ঘুড়ি ওড়ানোর কলাকৌশল। থাকপি, চুটকি, ঝিটকাত, লেটে, টেনে, টানামানি — কত ধরনের প্যাঁচ। তবে শুধু উত্তর কলকাতা কেন? খিদিরপুর এলাকার মেটিয়াবুরুজ, ওয়াটগঞ্জ, বাবুবাজার থেকে আসা ঘুড়ি-লাটাই-সুতোয় চলে মাঞ্জার জোরে পাঞ্জা লড়াই। একটা করে ঘুড়ি কাটে আর পায়রা উড়িয়ে দেওয়া হয় আকাশে। এটা উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যও বটে। পায়রার ডানায় ভর করে কারওর আনন্দ উড়ে যায়, ছেড়ে খেলা মাঞ্জাকে সঙ্গী করে এর-ওর চিলেকোঠার ছাদে বুক ছুঁয়ে। কারওর হতাশা নেমে আসে ছাদের মাটিতে, মনের গভীরে।

এই বিশ্বকর্মা পুজোতেও ঘুড়ি উড়বে। পারদচড়া রোদঝলমলে আকাশ থাকতে পারে আবার পেঁজা তুলো সরিয়ে নেমে আসতে পারে অঝোরধারা। বহু মানুষের কর্মমন্দিরের আশেপাশে বকাইদের ভিড় হবে একটা দিনের তুখোড় মাঞ্জার লড়াই নিয়ে। সেই সব মন্দিরের ছাদে বা ভেতরের চত্বরে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে মোমবাতি, শতরঞ্জি বা দোতেরা। এক আকাশ উৎসব এলেও মাটিতে অবজ্ঞা থেকেই যায়।  

আরও পড়ুন

0 thoughts on “পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি… যেন এক আকাশ উৎসব

  1. Ashoke Sengupta

    Beautiful!

মন্তব্য করুন