Search

হিমেল মাদকতায় রাস উৎসবে ভক্তের ঢল

হিমেল মাদকতায় রাস উৎসবে ভক্তের ঢল

papya_mitraপাপিয়া মিত্র

ভজনকুটিরে নিকোনো উঠোনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে জ্যোৎস্না। এ জ্যোৎস্না কার্তিকপূর্ণিমার, এ জ্যোৎস্না বড় প্রিয় বৈষ্ণবদের। উঠোনে স্নিগ্ধ আলপনা। ঈশান কোণে টাঙানো চাঁদোয়া, এক দিকে মঞ্জরিভরা তুলসীগাছ। বড়ো মায়াময় এ ছবি। তার থেকেও বড়ো প্রেমময় চাঁদোয়ার নীচে রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ। এ রাতেই বৈষ্ণবদের প্রাণের রাস উৎসব উদ্‌যাপিত হয়। বৃন্দাবনে কার্তিকজ্যোৎস্নায় শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের সঙ্গে নৃত্যগীতে মাততেন। সব গোপিনীরা নিজের সঙ্গি হিসেবে শ্রীকৃষ্ণকে দেখতে পেতেন। শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাই রাসলীলা।

রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহের চারদিকে সাজানো অষ্টসখীর মূর্তি। জমকালো পোশাকে সুসজ্জিত। সামনে ফরাস পাতা। তাতে সাজানো মৃদঙ্গ, মন্দিরা, হারমোনিয়াম, করতাল এবং আড়বাঁশি। সুগন্ধী ধূপ, আতর এবং ফুলের গন্ধে ম ম চারদিক। সন্ধ্যারতি শেষ, তিলক আঁকা এক বৈষ্ণবভক্ত বিগ্রহকে প্রণাম করে আড়বাঁশিটি তুলে নিয়ে তাতে দিলেন আলতো ফুঁ। বৈষ্ণবী গেয়ে উঠলেন মহাজনপদ ‑ বলয়া নূপুর মণি বাজয়ে কিঙ্কিণী/ রাস রসে রতিরণে কী মধুর শুনি। ভজনকুটিরের উঠোন আলাপের মূর্ছনায় বুঁদ হয়ে যায়। মাদকতায় সিক্ত হয় রাসপূর্ণিমার রাত। সাধারণত ভজনকুটির বা আখড়াগুলিতে এই ভাবে পালিত হয় রাস।

‘রস’ থেকেই রাস-এর উৎপত্তি। রস অর্থে সার, নির্যাস, আনন্দ, হ্লাদ, অমৃত ও ব্রহ্ম বোঝায়।  ‘তৈত্তিরীয়’ উপনিষদে রস সম্পর্কে বলা হয়েছে “রসো বৈ সঃ”। অর্থাৎ ব্রহ্ম রস ছাড়া আর কিছুই নয়। বৈষ্ণব দর্শনে এই রস বলতে মধুর রসকেই বোঝানো হয়েছে। আর পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ হলেন মধুর রসের ঘনীভূত আধার। তাঁকে ঘিরেই রাস। রাস কথাটির আভিধানিক অর্থ নারীপুরুষ হাত ধরে গোল করে নাচ করবে যা ‘হল্লীবক’ নৃত্য নামে পরিচিত। বৈষ্ণবদের কাছে রাসের অর্থ অন্য। বৃন্দাবনের যমুনাতটে শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের আহ্বান করেন এবং তাদের অহং-বর্জিত বিশ্বাস ভক্তিভাবে তুষ্ট হয়ে সঙ্গদান করেন। এ এক অনির্বচনীয় আনন্দ দান।

বৃন্দা অর্থাৎ তুলসী বন, বৃন্দাবন। আর ব্রজ অর্থাৎ গোচারণভূমি। গোবিন্দের মুখমণ্ডল, গোপীনাথের বক্ষ, মদনমোহনের শ্রীচরণ দর্শনের পূর্ণতা লাভ ব্রজভূমি তথা বৃন্দাবনে। তাই রাসপূর্ণিমায় ভক্তের ঢল নামে বৃন্দাবনে। পুরাণে বর্ণিত অসুর বিনাশ করে প্রেমধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে বিষ্ণুর অষ্টম অবতাররূপী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব। যদিও তিনি মানবরূপে আবদ্ধ তবুও তিনি সর্ববিরাজমান। তাই তিনি সৎ, চিৎ, আনন্দ। একই সঙ্গে পরমাপ্রকৃতি, পরমব্রহ্ম, ব্রহ্মানন্দ। শ্রীরাধাকৃষ্ণের বিহারস্থল মথুরা-বৃন্দাবন।

এই বৃন্দাবনেই বাঁশির সুরে মোহিত করে গোপিনীদের সঙ্গে লীলা করেন শ্রীকৃষ্ণ। কার্তিকপূর্ণিমায় এই লীলা রাসলীলা নামে পরিচিত। রসের এই লীলা প্রকৃতি থেকে পায় হিমেল মাদকতা। এখানেই যমুনায় স্নানে নামা গোপিনীদের বস্ত্র হরণ করেন নাগরকানাই। সেই অর্থে কৃষ্ণপ্রেমে সিক্ত এই ব্রজধাম। রাসপূর্ণিমার উৎসবের আলোয় আলোকিত মথুরা-বৃন্দাবন। নিধিবন বা নিকুঞ্জবন বা সেবাকুঞ্জে আজও রাতে লীলা বসে। বাঁকেবিহারী মন্দিরও একই সঙ্গে উৎসবমণ্ডিত হয়ে ওঠে।

কথিত, দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনের মধুবনে বাঁশি বাজাতেন। এই স্থানই বর্তমানে নিধিবন। ভক্তদের বিশ্বাস, এখনও রাতের আধাঁরে এখানে রাধাকৃষ্ণ ও গোপিনীরা রাসলীলা করেন। আজও ধ্বনিত হয় নূপুরের নিক্কণ শব্দ। রাতভর নৃত্যগীতের পরে দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই সব অদৃশ্য হয়ে যায়। তুলসীবনে ঘেরা এই মন্দিরে বাঁকেরাসবিহারীর পবিত্র বিগ্রহ রয়েছে।

এই নিধিবনে সব গাছের কাণ্ড ফাঁপা এবং ডালপালাগুলো নুয়ে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে শ্রদ্ধা জানানোই বলে ধারণা করা হয়। মন্দিরের চারপাশের মাটি যদিও রুক্ষ কিন্তু এলাকার সব গাছই সারা বছর সবুজ থাকে। ভক্তদের বিশ্বাস, এই গাছগুলো আসলে ব্রজভূমির গোপিনী। দিনের বেলা আগত ভক্তরা এখানে ভিড় করলেও বিকেল ৫টার পরে মন্দিরে কাউকে থাকতে দেওয়া হয় না। সন্ধ্যারতির পরে রাত আটটার মধ্যেই মন্দির বন্ধ করে দেওয়া হয়। দরজা বন্ধ করার আগে পূজারী রেখে আসেন শাড়ি, লাড্ডূ, পান-সুপারি, জল। ভক্তেরা বিশ্বাস করেন, রাধাকৃষ্ণ লীলার শেষে এই মন্দিরে আসেন বিশ্রামের জন্য এবং তাঁরাই সেই সময় ওই লাড্ডু ও পান-সুপারি, জল খেয়ে ক্ষুধা নিবৃত্তি করেন। রাতে মন্দির ঘিরে থাকা চারপাশের গাছগুলি গোপিনী রূপে দেহ ফিরে পান এবং রাসলীলায় অংশগ্রহণ করেন। সকালবেলা মন্দিরের দরজা খুললেই দেখা যায়‚ ভগবানের সেবার উদ্দেশে রাখা প্রতিটি জিনিসই সেবায় ব্যবহৃত হয়েছে। মন্দিরের পাশে ছোটো কুয়ো আছে। জানা যায় রাসলীলার সময় একদিন রাধা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে, তাঁর তৃষ্ণা মেটানোর জন্য শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বাঁশি দিয়ে কুয়োটি খনন করেন।

বঙ্গে রাসযাত্রার জন্য বিখ্যাত নবদ্বীপ, মায়াপুর, বিষ্ণুপুর, শান্তিপুর, কোচবিহার।

rasa-shanti
শান্তিপুরে রাস উৎসব।

শান্তিপুরে রাস হয় নবদ্বীপের পরের দিন। ৪ দিনের এই উৎসবে সাজসজ্জা ও আলোর সমারোহ দেখার মতো। বিগ্রহকে সোনার ও ফুলের গহনাতে সাজিয়ে তোলা হয়। ৩৬ রকমের পদ দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। তৃতীয় রাতে ভাঙা রাসে মানুষের ঢল নামে মন্দিরে মন্দিরে। গোস্বামীবাড়ি, মদনগোপাল ঠাকুরবাড়ি, রাধাবল্লভজিউ, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীবাড়ি, অদ্বৈতপাঠ এদের মধ্যে উল্লেখ্য। ভাঙা রাসের শোভাযাত্রার এক বিশেষ আকর্ষণ গোস্বামীবাড়ির কুমারী মেয়েদের রায়রাধার সাজ। এই শোভাযাত্রার প্রশস্তি আজ বিশ্ব জুড়ে।  

rasa-naba
নবদ্বীপে শাক্ত রাস।

নবদ্বীপে আখড়ায় আখড়ায় আয়োজিত এক মাঙ্গলিক সুগন্ধ। বৃন্দাবনের নিধিবন না থাকলেও এখানে একসময় রাস ছিল আখড়াসম্পর্কিত। বৈষ্ণবদর্শনে রাসের যে ব্যাখ্যাই থাকুক না কেন, বৈষ্ণব আখড়ায় যে ভাবেই রাস পালিত হোক না কেন, শহর নবদ্বীপ, চৈতন্যজন্মভূমি নবদ্বীপে এখন রাসের চেহারা অন্য রকম। পূর্ণিমার ভরা রাতে, বিশুদ্ধ তন্ত্রমতে শতাধিক শক্তিমূর্তির সাড়ম্বর পুজো। এটি হল নবদ্বীপের রাসের সংজ্ঞা। পূর্ণিমার রাতে দেড়শোর বেশি বিরাট বিরাট শক্তিমূর্তির পুজোর কারণে নবদ্বীপের রাসকে অনেকে ‘শাক্ত রাস’ বলেও অভিহিত করেন।  

rasa-coch
রাস উপলক্ষে কোচবিহারের মদনমোহনবাড়িতে ভক্তসমাগম।

কোচবিহারে এক ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন উৎসব রাসযাত্রা। ১৭তম রাজা মহারাজা হরেন্দ্রনারায়ণের রাজত্বকাল (১৭৮৩-১৮৩৯) থেকে এই উৎসব চালু হলেও এই নিয়ে বিতর্ক আছে। কোচবিহারের মদনমোহন মন্দির সংলগ্ন বৈরাগীদিঘির কাছে ভেটাগুড়ি থেকে প্রথম এই মেলা শুরু হয়। ১৯১২ থেকে রাসমেলা গ্রাউন্ড বা প্যারেড গ্রাউন্ডে হয়ে চলেছে। এখানে রাস উৎসবে শুধু শ্রীকৃষ্ণ মদনমোহন নামে পূজিত হন। এখানের প্রধান বৈশিষ্ট্য, জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলেই যোগ দেন এই রাসযাত্রায়। আর ঘূর্ণায়মান যে রাসচক্র পুজাপ্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয় তা তৈরি করে বংশ পরম্পরায় একটি মুসলিম পরিবার। কাগজ ও বাঁশ দিয়ে এটি প্রস্তুত হয়। এর গায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নানা ছবি চিত্রিত থাকে। প্রায় ১৫ দিন এই মেলা চলে।   

বিষ্ণুপুরের কৃষ্ণগঞ্জ, মাধবগঞ্জ ও বাহাদুরগঞ্জ মিলে রাসের মেলা হয়। বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পরে মল্লরাজারা যখন তাঁদের রাজধানী বিষ্ণুপুরকে ‘গুপ্ত বৃন্দাবন তীর্থ’ হিসেবে গড়ে তুলছিল। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ মল্লরাজা বীর হাম্বীর তৈরি করেন ১০৮ দরজার পিরামিড আকৃতির রাসমঞ্চ। সেই রাসমঞ্চে মল্লরাজাদের আমলে বিখ্যাত রাস বসত। মঞ্চটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের নিয়ন্ত্রণের আসার পরে ঠিকানা বদল করে রাস উৎসব ছড়িয়ে পড়ে বিষ্ণুপুরের তিনটি অঞ্চলে। কৃষ্ণগঞ্জে শ্রীশ্রীরাধালালজিউ, শ্রীশ্রীকৃষ্ণরায়জিউ ও শ্রীশ্রীগোবিন্দজিউ-সহ ১৩টি প্রাচীন বিগ্রহের সুসজ্জিত মণ্ডপ রয়েছে। মাধবগঞ্জের শ্রীশ্রীমদনগোপালজিউয়ের রাসউৎসবেও জমজমাট ভিড়। বাহাদুরগঞ্জের রাসটি চৌধুরীবাড়ির। সেখানে শ্রীশ্রীরাধাদামোদরঠাকুরজিউ-এর রাসপর্বও সমানভাবে আকর্ষক বিষ্ণুপুরবাসীর। প্রসাদ, আরতির সঙ্গে মেলার মান বেড়েছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন