Search

এ বার বড়িশার চণ্ডীপুজো ২২৪ বছরে, জোর চলছে মেলা

এ বার বড়িশার চণ্ডীপুজো ২২৪ বছরে, জোর চলছে মেলা

papya_mitraপাপিয়া মিত্র

রমরমিয়ে চলছে বড়িশার চণ্ডীমেলা। এখানকার চণ্ডীপুজো এ বার ২২৪ বছরে পড়ল। এ বার মায়ের মূর্তির আবরণ উন্মোচন করলেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের দিলীপ মহারাজ। প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই পুজো ১২০০ বঙ্গাব্দে সাবর্ণ চৌধুরী বংশের সন্তান মহেশচন্দ্র রায়চৌধুরী শুরু করেন। অগ্রহায়ণের শুক্লাষ্টমীতে এই পুজো হয়। পারিবারিক এ পুজো তিন দিনে সীমাবদ্ধ ছিল। পারিবারিক পুজোর সুবাদে তখন এত সমারোহ ছিল না। পাঁঠাবলির পাশাপাশি মোষবলিও হত। তবে চণ্ডীপুজো এখন সর্বজনীন।

chandi-1পুজোর আরও একটি দিক আছে। বাড়ির গা-লাগোয়া পুকুর। স্বপ্নাদেশে ওই পুকুর থেকে পাওয়া যায় একটি ঘড়া। সেই ঘড়া বাড়ির তিনতলায় রাখা আছে আজও। আর ওই পুকুর চণ্ডীপুকুর নামে পরিচিত। সেই ঘড়ায় পরানো হয় বেনারসি। ঘড়ার ওপরে রাখা আছে সিঁদুর মাখানো সশিষ ডাব। ডাবে রুপোর চোখ, শিষে সোনার নথ-সহ নানা অলঙ্কার ও মাথায় মুকুট। এই মায়ের মূর্তি। কিন্তু আমজনতার কাছে এই মূর্তি তেমন স্বচ্ছ নয়। তাই স্বপ্নাদেশে বর্তমান মন্দিরে গড়া হয় নির্ধারিত মূর্তি, পুজো চলে প্রতি দিন। তবে অষ্টমী ও নবমীতে পুজো দেওয়ার লাইন চোখে পড়ার মতো। এই পুজো ঘিরে বসে এগারো দিনের মেলা।

chandi-4প্রকৃতির খেয়ালে মেলা নিত্যনতুন রূপ ধরে। শীতের মেলা কখনও কুয়াশায় ঢেকে যায় আবার কখনও অসময়ের বৃষ্টির আবহে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যায়। তখন মেলার মানুষ অপেক্ষা করে গরম তেলে কখন ভেসে উঠবে বেগুনি-ফুলুরি-আলুর চপ। সাবেক মেলা এখন নেই, নেই সেই পুতুলনাচ বা হরবোলা। এক সময় এই চণ্ডীমেলায় বসত সার্কাস। আসত হাতি, বাঘের খেলা থাকত। রাতবিরেতে ছোটদের ভয়ও দেখানো হত। এলাকার মানুষেরা শীতের রাতে বাঘের গর্জনও শুনতে পেত। সে সব আজ গল্পকথা। এখন মেলাতে আছে মোটরবাইক রেস, দেশিবিদেশি নানা ফুলের সমারোহ। শোভা পাচ্ছে চিকেন বিরিয়ানি, মাটন বিরিয়ানির পাশাপাশি মোমো, সামুদ্রিক ফিশফ্রাই, চিকেন লালিপপ।

chandi-3ঘর-গেরস্থালির ব্যবহারের জিনিসের পাশাপাশি শঙ্খ, শাঁখা, পুজোর নানা উপকরণ আছে। বিভিন্ন জেলার আচার-বড়ি-হজমিগুলি-পাঁপড় থেকে হাতের কাজের নানা সম্ভারে মেলা রঙিন হয়ে উঠেছে। কৃষ্ণনগরের পুতুল নিয়ে রামলাল আসছে দশ বছর ধরে। বিক্রির কথায় যথারীতি উঠে এল টাকাপয়সার কথা। তাই বাজার ঠিক জমেনি। একই কথায় সায় দিল মাটির নানা সবজি বিক্রেতা বিশ্বনাথ পাল। এ বারে মেলায় নতুন সংযোজন ট্রয় ট্রেন, মিনি খাস্তাগজা, ভাজামাছ। বিদায় নিয়েছে মরণকূপের খেলাটি।

চণ্ডীপুজো ঘিরে যে সাংস্কতিক অনুষ্ঠান আজ দীর্ঘ বছর ধরে হয়ে আসছে তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এই প্রজন্মও। নানা শিল্পীর সমাবেশে পুজোপ্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে। রবিশঙ্কর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মান্না দে, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, অংশুমান-মানবেন্দ্র থেকে  শুরু করে কে আসেননি এই অনুষ্ঠানে? আজও আলো করেন মনোময়, শ্রীরাধা, স্বাগতালক্ষ্মী শম্পা কুন্ডুরা। মেলার আরও একটা দিক আছে। প্রতিবন্ধী দিবস, নারী দিবস, যুব দিবস, শিশু দিবস পালন করা হয় একাধিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে।

মেলার নানা পসরার মধ্যে যেন ভুরিভোজের চাহিদা বড় বেশি। সিউড়ির নানা ফলের আচারের পাশাপাশি, পিঠেপুলির ঠেলাঠেলি চোখে পড়ার মতো। দুপুরের মিঠে রোদ গায়ে মেখে নতুন নতুন মুখের ভিড় মেলাতে। কড়াইতে বালি-ছানচায় ভুট্টা আর বাদামের সহবাসের স্বাদ নিতে ভুল হয় না নবাগতের। পেল্লাই ডেকচিতে খুন্তির সোহাগে ভেজিটেবল চপের পুর তৈরি হয়ে যায়। সকালের দিকে দোকানের ঝাঁপ তুলে গনগনে আঁচে জ্বাল হচ্ছে জিলিপির রস। কড়াভর্তি গুড় যাচ্ছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে বেসনের কাঠি। জন্ম নিচ্ছে গুড়কাঠি। গামলা ভর্তি রসবড়ার সোহাগ নেওয়ার জন্য মানুষ ঘর ছেড়ে আজ মেলামুখো।

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন