Search

সহজ কথা সহজ গানে ‘কালো মাছের গল্প’

সহজ কথা সহজ গানে ‘কালো মাছের গল্প’

natok-lekhokসৈকত ভকত

পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্রের উদ্যোগে সল্টলেকের ভারতীয়ম কমপ্লেক্সে যে বৃহৎ নাট্যমেলা হয়ে গেল সম্প্রতি, সেখানে প্রদর্শিত হল পূর্ব কলকাতা বিদূষক নাট্যমণ্ডলীর প্রযোজনা ‘কালো মাছের গল্প’। ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীরে উত্তর ইরানের আজারবাইজান প্রদেশে গল্পটি লিখেছিলেন সামাদ বেহরাঙ্গি। সেই ছয়ের দশকে। ইরানে তখন পহ্‌লবি রাজবংশের স্বৈরতন্ত্র। লোকগল্পের আঙ্গিকে লেখা শিশুপাঠ্য সেই গল্প নিষিদ্ধ হয়। রূপকের আড়ালে বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচারের অভিযোগে। মাত্র আঠাশ বছর বয়সে ইরানের আরস নদীতে ডুবে লেখকের অকালমৃত্যুটিও বিতর্কিত। মৃত্যু, না হত্যা; তৎকালীন রাষ্ট্রের হাত ছিল কি না, সে সব প্রশ্ন অতীত। শুধু রয়ে গিয়েছে সেই ছোট্ট কালো মাছ বা ‘দ্য লিট্‌ল ব্ল্যাক ফিশ’। তৃতীয় দুনিয়ার আধুনিক সাহিত্যের একটি বিখ্যাত প্রতিবাদী গল্প হিসেবে। বাংলায় গল্পটির অনুবাদ করেছিলেন প্রয়াত কমলেশ সেন। বিদূষকের প্রযোজনাটি সেই গল্পেরই নাট্যরূপ। রূপান্তর রাজা বিশ্বাস। natok-1  

জনৈকা বৃদ্ধা মাছের জবানিতে গল্পটি শুনছে তার বারো হাজার নাতিপুতি। পাহাড়ি এক ঝরনার ঘূর্ণিতে থাকে কিছু ছোটোখাটো মাছ। তাদের মধ্যে এক ক্ষুদ্রকায় কৃষ্ণা কিশোরী তার মাকে জানাল, সে ঝরনার শেষ দেখতে বেরোবে। প্রথমেই মায়ের আশঙ্কা, তার পর বিজ্ঞ পড়শিদের নিষেধ। কালো মাছ সে-সব টপকে বেরিয়ে পড়ল। শুরু হল অভিযান। একের পর এক রোমাঞ্চ। জীবনের নতুন নতুন অভিজ্ঞতা, যা কল্পনাতেও আনতে সাহস পায় না কূপমণ্ডূকের দল। পথে মণ্ডূক পরিবারের সাথেও দেখা হয় কালো মাছের। সেই ব্যাঙাচিদের নিয়ে তার তো মজার একশেষ। তার পর কাঁকড়ার প্রলোভন এড়িয়ে গিরগিটির কাছে অস্ত্রশিক্ষা, নদীতে গলাঝোলা সারসের মোকাবিলা — এগোতে থাকে কালো মাছ। ঝরনার শেষ সে দেখবে। ঘরে ফেরা হবে কি না, এ নাটক তা জানে না।natok-2

মিউজিক্যাল নাটকটিতে অভিনেতারা সকলেই গাইছেন, বাজাচ্ছেন, নাচছেন। সোয়া ঘণ্টার নাটকে বিশ-বাইশটা গান। সুন্দর সুর করেছেন কোরক সামন্ত। গেয়েছেনও দারুণ। গিটার ও কণ্ঠসঙ্গীতে সুযোগ্য তাঁর সহযোগী দীপ্তজিৎ নাথ ওরফে ডোডো। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন নীতীশ-সহ বাকি অভিনেতারাও। কালো মাছের ভূমিকায় পরিচালক অমিত সাহা স্বয়ং। পরে অবশ্য বললেন, নেহাতই ফেরে পড়ে তাঁর এ অভিনয়। পরের শো থেকে করবেন অর্পিতা ব্যানার্জি। এ বারে তিনি রিহার্সালে আহত হয়ে পড়েন। যাই হোক, অমিতের অভিনয় দক্ষতা অসাধারণ। আরও উল্লেখযোগ্য চরিত্রচিত্রণে তাঁর নিষ্ঠা। জলের ভেতর মাছের চলাফেরা, প্রচলিত সংস্কারের উত্তরাধিকার ভেঙে নতুনকে আবাহনের স্ফূর্তির মধ্যে যে দ্বান্দ্বিকতা, এ সব অমিত বহন করেছেন স্বচ্ছন্দে। কাঁকড়া, কালো মাছের মা, চাঁদের বুড়ি, ইত্যাদি একাধিক চরিত্রে স্বাধীনা চক্রবর্তী বেশ সাবলীল ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। নীল, প্রিয়তোষ, ডোডো, কোরক-রাও তাঁদের অভিনয়ে যথেষ্ট সচেষ্ট। নাটকে সেটের ব্যবহার অল্পই, তবে নাট্যানুগ। সার্বিক পরিচালনা প্রশংসনীয়।natok-3

নাটকটির প্রযোজনা বেশ কিছুটা বাদল সরকারের তৃতীয় নাট্য ঘেঁষা। একেবারে বাহুল্যবর্জিত। সহজ কথা সহজ করে বলা, সহজ হয়ে বলা যে কত তাৎপর্যপূর্ণ তা আরেক বার উপলব্ধি করার জন্য এ নাটক অবশ্যই দেখা উচিত। কারণ, রূপকথার সিংদরজায় যখন পাহারা বসে, তখন কিছু সৃষ্টিছাড়া তো চিরকালই থাকে যারা পাহারাদারের চোখে চোখ রেখে আবৃত্তি করে মুক্তির বাণী। তাদেরই ভরসায় পৃথিবীর এখনও অবিরাম ঘুরে চলা, মানুষের বেঁচে থাকা। এমনকি পাহারাদারেরও।

লেখক নাট্যকর্মী ও চলচ্চিত্রকার

ছবি: সন্দীপ রায়

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন