khabor online most powerful bengali news

‘অন্য থিয়েটার’-এর অন্য রকম প্রতিবাদে বর্ষবরণ

sumitraসুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলার সুবিখ্যাত নাট্যদল ‘অন্য থিয়েটার’ ১৯৯৯ সাল থেকে অন্যরকম ভাবে ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যাবেলা থেকে ১ জানুয়ারি সকাল পর্যন্ত বর্ষবরণের আয়োজন করে আসছে। বহু বিচিত্র বর্ণময় নাট্যানুষ্ঠানের জন্য নাট্যশিল্পী ও দর্শকের কাছে খুবই সমাদৃত ‘অন্য থিয়েটার’-এর এই ‘নাট্যস্বপ্নকল্প’ অনুষ্ঠানটি। ২০১৬ সালের শেষ দিনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজনে কিছু পরিবর্তন হয়েছে, সে প্রসঙ্গে ‘অন্য থিয়েটর’-এর কর্ণধার বিভাস চক্রবর্তী ‘খবর অনলাইন’ কে জানান, “মাঝখানে দু’বছরকে রাজনৈতিক কারণে বাদ দিলে কখনও বন্ধ হয়নি সর্বস্তরের, সবদলের নাট্যকর্মীদের এবং দর্শকদের পছন্দের ‘নাট্যস্বপ্নকল্প’। প্রতি বছর ছ’টা নতুন নাটক, ছ’ জন পরিচালক নির্মাণ করেন। সেই সব প্রযোজনা এবং আনুষাঙ্গিক সব খরচ, যেমন হল ভাড়া, বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য খরচ ধরে আনুমানিক ছ’লক্ষ টাকা খরচ  হয়। গত বছরের আগের বছর এই অনুষ্ঠানের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক অনুদান দিয়েছিল পাঁচ লক্ষ টাকা। কিন্তু হঠাৎ করে গত বছরে মন্ত্রকের আমলারা মিটিং করে ৯০% অনুদান কেটে পরিমাণ করে দেয় ৫০ হাজার টাকা। এটা ঠিক মন্ত্রকের দোষ নয়, যে সব আমলারা সমস্ত কিছু ঠিক করেছেন তাঁদের আসলে ঠিক ধারণাই নেই। তখন খুব রাগ হয়, ঠিক করি এ বারের অনুষ্ঠানটা একটু অন্যভাবে করব, আর সেই মঞ্চ থেকেই যা প্রতিবাদ করার বা বলার বলব”।

bibhash-chakraborty

 

অনুদান অপ্রতুল হওয়ায় এ বার সারা রাত ‘নাট্যস্বপ্নকল্প’ না হলেও ৩১ ডিসেম্বর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এবং ১ জানুয়ারি সন্ধ্যাবেলা যথাক্রমে অ্যাকাডেমি ও মধুসূদন মঞ্চে ‘অন্য থিয়েটার’-এর উদ্যোগে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্যর খামতি ছিল না। ৩১ তারিখ সকালে বিতর্ক সভার বিষয় ছিল ‘বাংলায় হাসির নাটকের এন্তেকাল হয়ে গেছে’। আলোচনায় সঞ্চালক ছিলেন অশোক মুখোপাধ্যায়। পক্ষে ও বিপক্ষে সভার উত্তাপ বাড়ান চন্দন সেন, সৌমিত্র বসু, দেবাশিস রায়-সহ অনেকে। এর পর অভিনয় হয় ব্রাত্য বসুর লেখা, দেবাশিস রায়ের নির্দেশনায় নাটক ‘জীবজন্তু’। দুপুরে ছিল বেলঘরিয়া অভিমুখের প্রযোজনা, কৌশিক চট্টোপাধ্যায় রচিত-নির্দেশিত নাটক ‘কোজাগরী’ । সন্ধ্যাবেলা জীবনকৃতি সম্মান তুলে দেওয়া হয় সীমা মুখোপাধ্যায়কে। সেই সঙ্গে ‘এক মঞ্চে রবীন্দ্রনাথ ও শেক্সপিয়ার’ শীর্ষক অভিনয়ে ছিলেন অনুসূয়া মজুমদার ও বিপ্লব দাশগুপ্ত। ১ তারিখে মধুসূদন মঞ্চে নাট্যনির্মাণ সম্মান ২০১৬ প্রদান করা হয় ব্রাত্য বসুকে, পাইকপাড়া ইন্দ্ররঙ্গ প্রযোজিত ‘অদ্য শেষ রজনী’ নাটকটি নির্মাণের জন্য। অশীতিবর্ষ উদযাপনে বিশেষ সম্মান প্রদান করা হয় শ্রী অরুণ মুখোপাধ্যায়কে। সবশেষে ‘অদ্য শেষ রজনী’ নাটকটি অভিনয়ও হয়।

 

anya-theatre-1

 সামগ্রিক অনুষ্ঠান পরিকল্পনার পশ্চাদপটে নিজের ভাবনার কথা বলতে গিয়ে বিভাসবাবু জানান, “রসবোধ উঠে গেছে। নিজেকে নিয়েই রসিকতা করা বা অন্যকে নিয়ে, আজকাল খুব দেখা যায় না। আমরা খুব সিরিয়াস গম্ভীর হয়ে পড়ছি। সবাই খুব সমস্যা বুঝি। সচেতন – তাই উপভোগ্য বস্তু কম। না সাহিত্য, না সিনেমায় – কোথাও হাস্যরস নেই। যা আছে সব মোটা দাগের। নাটকেও এক সময় শম্ভু মিত্রের সে দিন বঙ্গলক্ষ্মী ব্যাঙ্ক-এর অথবা চার অধ্যায়ের সংলাপের কথা মনে পড়ছে । উৎপল দত্তের অজস্র নাটক, সাহিত্যে বিভূতি মুখোপাধ্যায়, শিবরাম, তারাশঙ্কর এঁদের লেখায় যে হাস্যরস থাকত, এখন সাম্প্রতিক কালের সাহিত্যে-নাটকে তা পাই না। তাই বিতর্কের বিষয় ছিল – হাসির নাটকে এন্তেকাল হয়েছে। দেখা গেল দর্শকরাও এই মতকেই সমর্থন করছেন”।

anya-theatre-2016

‘কোজাগরী’ সম্পর্কে বিভাসবাবু বলেন, “অসাধারণ প্রযোজনা, অভিনয়। সত্যিকারের প্রতিবাদী নাটক। ছিঁচকে প্রতিবাদী বা চিমটি কেটে একটা সংলাপ গুঁজে প্রতিবাদ নয়। এটা সার্বিক প্রতিবাদের একটা নাটক। এই সময়ের একটা সর্বাঙ্গীন প্রতিনিধিত্ব করছে ‘কোজাগরি’। দেখতে দেখতে  ভয় করে। কোথাও চিৎকৃত প্রতিবাদ নেই। আর্টিস্টিক্যালি হ্যান্ডেলড। তাই বর্ষ শেষের অনুষ্ঠানে এই নাটকটাকে আমরা নির্বাচন করেছি। দর্শকদের প্রতিক্রিয়াতেও দেখা গেল সকলের ভালো লাগেছে। আমি চাই এ রকম নাটক আরও হোক”।

ভবিষ্যতে আবার সারারাতের অনুষ্ঠান আয়োজনে ফিরে যাবেন কি না জানতে চাওয়া হলে বিভাস চক্রবর্তী জানান, “নাট্যকর্মী ও দর্শকের মধ্যে সেই দাবি উঠেছে। তবে বর্ষশেষের অনুষ্ঠানের এই নতুন ফর্ম্যাটটা অসফল হয়নি। ভিড় হচ্ছে ভালো। টিকিট বিক্রিও হয়েছে। আসল কথা হল, থিয়েটরের মানুষরা একজোট হয়ে সেলিব্রেশন করব। কিন্তু এমন তো হয় না। সারাজীবন চেষ্টা করে থিয়েটারের যৌথ মঞ্চ হল না। পাশে দাঁড়ায়নি কেউ। বন্ধুরাও কিছুদিন থেকে সরে গেছে। সেখানে যৌথ কাজ, এমন যৌথ মঞ্চ আরও বেশি করে দরকার”।

নতুন বছরে থিয়েটারকে ঘিরে কী স্বপ্ন দেখছেন?  বা আদৌ দেখছেন কি না তা জানতে চাওয়া হলে বিভাসবাবুর প্রতিক্রিয়ায় অতিরিক্ত জীবনীশক্তি দেখা যায়। তিনি বলেন, “থিয়েটারের লোক প্রান্তিক, প্রশাসন কেয়ার করে না। প্রাপ্য সম্মান পায় না। কাজের মধ্যে দিয়ে থিয়েটার সেটা অর্জন করুক। থিয়েটারের লোকেরা নিজেদের শক্তিটাকে চিনুক।  নিজেকে আবিষ্কার করুক। শুধু, আমি কী পেয়ে যাব? আমার গ্রান্টটা ঠিক আছে তো, আমি কী পুরস্কার পাব – এই জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে, একটু সবাইকে নিয়ে থিয়েটরের লোকেরা ভাবুক”।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন