নাটকের দর্শক কি ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ-ইউটিউবের চাপে বিলীন হচ্ছে

0
1103

ছোটন দত্তগুপ্ত

‘থ্যাটারে লোক শিক্ষে হয়’। শিক্ষে কি সব উইকিপিডিয়া, ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ-ইউটিউবই দিয়া ফেলিতেছে; না সেলফি তুলিয়া মলে বসিয়া যদি নিমেষে রোমিও-জুলিয়েট (পড়ুন দীপিকা পাডুকান ও রণবীর কাপুর হিসেবে) বানাইয়াই নিজেকেই দেখিতে পাওয়া যায় তবে মঞ্চে আধো-অন্ধকারে রোমিও-জুলিয়েটদের দেখিতে যাওয়ার কী প্রয়োজন? হাতের মধ্যে বিশ্ব, এক কিলিকে সব পাই, ঢেঙিয়ে নাটক দেখতে আসবো কেন? কলকাতার নাট্যমঞ্চে দর্শক উবে যাওয়ার এই মন্তব্য বেশির ভাগ নাট্যকর্মীর। দর্শকের অবস্থা খুবই সঙ্গীন, তা গত দু’বছর ধরে নাটকের দর্শকদের ওপর কাজ করার তথ্য; তাই প্রমাণ করছে। কলকাতার মঞ্চস্থ নাটক প্রতি গড় টিকিট বিক্রি হয় ৫০-৭৫টা। এই দর্শক প্রাপ্তির বেশির ভাগটাই একাডেমি-গিরিশ মঞ্চ-তপন থিয়েটার-মধুসূদন মঞ্চগুলির জন্য।

বেহালা কলেজের বাংলার অধ্যাপক পীযুষকান্তি হালদারের মতে, কলকাতায় বিনোদনের অনেক কিছু আছে, তাই দর্শকের এই হাল। অথচ, মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটকের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছেন, গ্রামে ওর কঠিন নাটকগুলোতেও ভিড় উপচে পড়ছে। গ্রামের দর্শকদের সঙ্গে আলাপে জেনেছেন, মোহিতের নাটক নাকি ওঁদের নিজেদের জীবনের সাথে মিলে যায়। পীযুষ মাস্টারের কথা পোক্ত হয়, যখন একাডেমির সামনে রাজমিস্ত্রি মহম্মদ ইসমাইল লস্করের সাথে সাক্ষাৎ হয়। দেশের বাড়ি দক্ষিণ ২৪পরগনার মগরাহাট। বর্তমানে নিউ মার্কেটের কোনো অন্ধকার সিঁড়ির তলায় রাত কাটান। কিন্তু মাসে অন্তত দুটো নাটক দেখবেনই; রাজনৈতিক নাটক বেশি পছন্দের। শহরে দেখা প্রিয় নাটকের নাম জানতে চাইলেই বলে ফেললেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। অথচ সেই মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটকগুলোতেই শহরের নাট্যমঞ্চে টিকিট বিক্রি হচ্ছে না। শহুরে নাটকের উপস্থাপনা কি শহরের দর্শককে আকৃষ্ট করছে না! না কি পরিচালকের আঙ্গিকের ভারে নাটকের বিষয় বস্তুই জটিল লাগছে দর্শকদের! বিজ্ঞানে একটা কথা আছে, সেই জিনিয়াস, যে কঠিন জিনিসকে সহজ করে বলতে পারে। বেদবাক্যের প্রবাদ আওড়িয়েও পরিচালকরা যদি ফলিতশিল্প চর্চা দর্শকদের তোয়াক্কা না করেই করেন, তবে দর্শকের হাল ফেরা মুশকিল।

২৫০০ নাটকের দর্শকের সাক্ষাৎকার নিয়ে আমরা দেখেছি ২৫ বছর বয়সের মধ্যে দর্শক মাত্র ১০.৭০%। ২৬ থেকে ৫০ বছরের দর্শক আছেন ৪৬.২৫%। আর ৫১ বছরের ওপরে আছেন ৪৩.০৫%। অল্প বয়সের যে সমস্ত ছেলেমেয়েদের আমরা দেখতে পাই, তাঁদের বেশির ভাগই কোনো না কোনো দলে অভিনয় করেন।

কলকাতা সহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রায় ৪০০ নাটকের দল আছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় এক হাজার। কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণের নাট্যমঞ্চে নাটকের দর্শক পনেরো হাজারের মতো। পনেরো হাজার দশর্কই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব মঞ্চে গিয়ে নাটক দেখেন। নতুন শহুরে মানুষ কিন্তু খুব একটা নাটক দেখতে আসেন না। এই দর্শকদের মধ্যে আবার ১৫% নাট্যকর্মী। গিরিশ মঞ্চে ১২/২/২০১৫ তারিখে পূর্ব-পশ্চিম দলের ‘রক্তকরবী’ নাটকের মুখ্য অভিনেতা ছিলেন গৌতম হালদার। গৌতম নাটকের মেগাস্টার। নাটক-দল- পরিচালকদের নাম না দেখলেও গৌতম হালদারের নাম দেখেই দর্শক নাটক দেখতে আসেন। তবুও ‘রক্তকরবী’র মতো নাটকে মাত্র দেড়শো টিকিট বিক্রি হয়। একাডেমিতে ১৩/২/২০১৫ তারিখে ‘হযবরল’ দলের ‘জাহানারা জাহানারা’ নাটকের দর্শক হয় মাত্র পঞ্চাশ জন। নাট্য পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত নাটকের নিজস্ব দর্শক রয়েছে। ‘যারা আগুন লাগায়’ নাটক তপন থিয়েটারে প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ হলেও ১৫/২/২০১৫ তারিখে একই নাটকে জ্ঞান মঞ্চে মাত্র সত্তরটা টিকিট বিক্রি হয়। ২/৩/২০১৫ তারিখে চার্বাকের মজার নাটক ‘দুধ খেয়েছে ম্যাও’তে ১৩০টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। একাডেমি ২৬/২/২০১৫ তারিখে ‘বহুরূপী’র ‘আত্মঘাতী’ নাটকে দর্শকাসনে ছিলেন মাত্র চল্লিশ জন। সেই সময়, শর্মিলা চানুর জ্বলন্ত বিষয়ের ফুটন্ত প্রযোজনা হওয়া সত্ত্বেও সীমা মুখোপাধ্যায় পরিচালিত নাটক ‘ছায়াপথ’-এ একাডেমিতে ৭/৩/২০১৫ তারিখে  দর্শকাসনে ছিলেন মাত্র ১৫০জন, সেদিন আবার শনিবার ছিল। একাডেমি হল কলকাতার গ্রুপ থিয়েটারের মক্কা। সেই একাডেমিতেই টিকিট বিক্রির হাল এই।

কোন শনি ধরলো নাট্যমঞ্চের? কেউ বলছেন মূল্যবোধ নেই; কেউ বলছেন বিশ্বায়ন; আরও বলাবলির মধ্যে আছে – টিভি-সিরিয়াল, মাথায় কেরিয়ারের বোঝা, পিঠে ব্যাগের চাপ, পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বদলে জলসা এবং স্বপনদা’দের অভাব। যে স্বপনদা’রা ছেলে পুলে নিয়ে পাড়া-নাটক করত, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের ফুটবল খেলা দেখতে নিয়ে যেত কন্ডাক্টরের কাছে অপমানিত হয়েও; পাড়ার স্পোর্টস, মাছ ধরা, ঘুড়ির মাঞ্জায় নুন দিয়ে বাচ্চাদের খ্যাপানো, সব কিছুতেই পোলা পানদের হৈ হৈ করে সব বিষয়ে প্রাইমারি শিক্ষা দেওয়ার বীজ বুনে দিত, সেই স্বপনদা’রা আজ হারিয়ে গেছেন। তাই হয়তো লোকশিক্ষেতে শিক্ষার্থীর অভাব।

২৫০০ নাটকের দর্শকের সাক্ষাৎকার নিয়ে আমরা দেখেছি ২৫ বছর বয়সের মধ্যে দর্শক মাত্র ১০.৭০%। ২৬ থেকে ৫০ বছরের দর্শক আছেন ৪৬.২৫%। আর ৫১ বছরের ওপরে আছেন ৪৩.০৫%। অল্প বয়সের যে সমস্ত ছেলেমেয়েদের আমরা দেখতে পাই, তাঁদের বেশির ভাগই কোনো না কোনো দলে অভিনয় করেন। পাইপ লাইনে পোলা-পান নাটকের দর্শক কিন্তু তলানিতে!

স্বপনদা, বাবা-মা, কাকু, মামাদের হাত ধরে নাটক দেখা যদি দর্শক তৈরি করার উৎস হয়, তবে বর্তমানে পরীক্ষা-প্রোজেক্টের বিস্ফারিত আবহাওয়ার চাপে বাবা-মামা- কাকুরা ছেলে-মেয়ে, ভাগনা-ভাগনি, ভাইপো-ভাইঝিদের নাটক দেখার কথা বলতেই সাহস পায় না, যা সত্তর এবং আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছিল। তাই বেশির ভাগ দর্শক চল্লিশের ওপরের।

বোরোলিনের সংসার, হাতুড়ি মার্কা ফিনাইল এক্স বা বিবিধ ভারতীয় নাটকগুলোও নাট্যদর্শক তৈরির বীজ বপন করত। এখন তো কর্পোরেট বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তার জন্য ইউটিউবে চলে গেছে। শুধু ভালো বিষয় হলেই আজ চলবে না, ফর্মটা দর্শকদের ফ্রেন্ডলি হতে হবে। ‘অরকুট’ ও ‘ফেসবুক’ – এর দুটোরই মূল বিষয এক, দুটোই ২০০৪ সালে তৈরি  কিন্তু ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গুগল ‘অরকুট’ বন্ধ করে দেয়। আর ‘ফেসবুক’-এর ফ্রেন্ডলি ডিজাইনের জন্য তা আজ মধ্যগগনে।

দর্শকের ঘাটতি কি শুধু সময়ের জন্য, না কি সময়োপযোগী নাটকের অভাব! আজকাল নাট্যকর্মীরা বেশির ভাগ সময়ে ‘প্রফেশনাল’ কথাটা ব্যবহার করেন; করার কারণও সঙ্গত। এক জন কর্মী অনেক দলের দায়িত্বপূর্ণ কাজ করে থাকেন। প্রচুর ওয়ার্কশপ করেন বা করান। ওয়ার্কশপের খুবই প্রয়োজন। কিন্তু বহু নাটকে বিষয়বস্তু চাপা পড়ে গিয়ে হাত-পা ছোঁড়ার দাপাদাপি অসহ্য করে তোলে দর্শককে, যা সার্কাসে পরিণত হয়, আর নাটক থাকে না। প্লেটো বলেছেন, অভিনেতা নিজের দেহ ত্যাগ করে অন্যের দেহে প্রবেশ করেন। অন্য ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব লাভ করেন। অন্য ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয়। মস্তিষ্কের চর্চা ছাড়া কি অন্য দেহে প্রবেশ করা সম্ভব? এক প্রচলিত ঘটনার কথা তুলে ধরলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে, অন্যের দেহে প্রবেশ করার দর্শন না বুঝে, বাস্তবে প্রয়োগ করতে চান এক নাটকের নায়ক। নায়কের চরিত্র ছিল মাতালের। নায়ক পরিচালককে বলেন, আমি সত্যি সত্যি মদ খেয়ে অভিনয় করব। পরিচালক মাথা চুলকে বলেন, শেষ দৃশ্যে কিন্তু নায়কের বিষ খাওয়ার সিন আছে – অভিনেতার মগজের অপুষ্টির জন্য বহিরাবরণের ভাষা ফুটে উঠছে না; তাই হয়তো দর্শকও গ্রহণ করতে পারছেন না। বাংলা গানের ভাষা এবং ফর্ম যে আমূল পালটে দেওয়ার সাহস দেখিয়েছেন সুমন-নচিকেতারা, সেই তুলনায় পেশাদার নাটককর্মীরা সময়োপযোগী গবেষণামূলক নাটক উপস্থাপনা করার সাহস খুব একটা দেখাতে পারেননি। গ্রুপ থিয়েটারে শুধু নিজের পরিচিতির মধ্যে ভালো-খারাপ মন্তব্য শোনার অভ্যেস কিছুটা আছে। কিন্তু দর্শকের বক্তব্য শুনে নাটক নিয়ে গবেষণা খুবই কম। অতীতে দল ভাঙ্গার বেশির ভাগ কারণ ছিল দর্শন বা ফর্ম, কিন্তু বর্তমানে, ব্যক্তি ইগো থেকে নতুন দল তৈরি হচ্ছে বেশি। সবাই পরিচালক ও নাট্যকার হয়ে যাচ্ছেন। নাটক মঞ্চেই থেকে যাচ্ছে, দর্শকের একাত্ম আর হচ্ছে না।

প্রসেনিয়াম থিয়েটার করলে দর্শকের জন্য বিষয়বস্তু, আঙ্গিক নিয়ে তো ভাবতেই হবে – মহম্মদ যখন পর্বতের কাছে যাবে না, তখন এমন সুনামির মতো প্রযোজনা তো প্রয়োজন, যেখানে পর্বত (দর্শক) একাডেমির কাছে আসবে। বাদল সরকারের ‘থার্ড থিয়েটার’ তো করছি না, যেখানে দর্শক ও অভিনেতাদের মন্তাজ হয়। দর্শকদের টিকিট কাটার প্রয়োজন হয় না। বাদল সরকারের অনুগামী নাট্যগবেষক সুবোধ পট্টনায়ক দু’জন অভিনেতাকে সাইকেল (সাইকো থিয়েটার) দিয়ে দূরে শ্রমিকদের মহল্লায় (দর্শকের ঘরে গিয়ে) অভিনয় করতে পাঠান, পর্বতের কাছে চলে যান, তাঁর দর্শকের কথা ভাবার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আঙ্গিক বা প্রসেনিয়াম থিয়েটার করলে তখন তো দর্শককে আকৃষ্ট করার শহুরে নাটক নিয়ে ভাবতেই হবে। যে হেতু টিকিট কেটে দর্শক নাটক দেখেন, এই আর্থিক সঙ্কটের সময়েও।

দর্শক দেখুক বা না দেখুক, টিকিটের দাম কিন্তু একশো টাকার নীচে রাখছে না দল গুলো। ভাবনার প্রথম কারণ হল, নাটক যারা দেখবেন, তাঁরা একশো হোক, আর দুশো হোক দেখবেনই, এই ভাবনা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। এই বাজারে বহু ইচ্ছুক মানুষের চড়া দামে টিকিট কেটে নাটক দেখা সম্ভব হয় না। আমি এক পরিচালককে বলেছিলাম, টিকিটের মূল্য কমানোর জন্য। তাঁর উত্তর ছিল, কম দামের টিকিট রাখলে অল্প বয়সের ছেলেমেয়েরা প্রেমালাপ করতে আসন দখল করে। নাটক দেখে না। মানে বাঘ যদি মানুষ খায়, বনের সব বাঘ মেরে ফেলতে হবে। টিকিটের মূল্যবৃদ্ধির জন্য যে অনেক দর্শক বিলুপ্তির (অল্প বয়সের দর্শকদের বড়ো সমস্যা) পথে, তা নিয়ে কেউ ভাবছেন না।

দর্শক কিন্তু আছে, সংখ্যায় নয়, গুনমানে। এমন দর্শক; যে কোনো নাট্যকর্মীর পরমায়ু হাজার বছর বাড়িয়ে দেবে। ভিআইপি রোডের বাসিন্দা শ্রীমতী শ্রীলা বিশ্বাস এবং তাঁর অন্ধ স্বামী নিয়মিত একসঙ্গে নাটক দেখেন, মানে নাটক শুনেই নাটকের আনন্দ-দুঃখ উপভোগ করেন। নিউ গড়িয়ার স্বপ্না ভৌমিক উপহার হিসেবে নাটকের টিকিট দিয়ে থাকেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের সাতচল্লিশ বছরের ভবতোষ সারঙ্গি রবিবার কলকাতা এসে তিনটি নাটক দেখে বাড়ি ফেরেন। আশি বছরের এস এন ভট্টাচার্য ৬২ বছর ধরে নাটক দেখছেন। শিশির ভাদুরির ‘সীতা’, ‘সাইকেল’ দেখেছেন।

ঊনষাট বছরের জি গাঙ্গুলি পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত নাটক দেখছেন, অতীতে নাটক দেখতেন না, অফিসের সহকর্মীর উৎসাহে নাটক দেখা শুরু। এই শুরু করানোর মানুষের খুবই প্রয়োজন। আমাদের পাড়া-স্কুলে নাটক  শুরু করতে পারলেই নাটকের দর্শক তৈরি হবে। সমস্ত নাট্যকর্মীকে স্বপনদার উত্তরাধিকারের দায়িত্ব মাইক্রো লেভেলের হলেও; নিতেই হবে।

বিজ্ঞাপন

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here