ফেলুদা হয়তো পাশ করল এবার

0
93

pritha-editedপৃথা তা
বাঙালির, পরনে গামছা হলেও এখনও গায়ে ঠাকুরদাদার শালটা রয়ে গেছে। তারই অন্যতম প্রধান নকসাগুলির মধ্যে একটি হল সত্যজিৎ আর তাঁর সৃষ্টি। আমাদের তর্কের বর্ম, ছেলেবেলার নস্টালজিয়া, সবটাই এখনও বেশ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে এটার ভিতর।
হলে এবার প্রথম দিনেই বেশ কিছু কচিকাঁচার ভিড় দেখা গেল বাবা মায়ের সঙ্গে। মধ্যভাগে তাদের পাঁচ-ছ’ জনের সাথে আলাপ করে জানা গেল, ১ জন বাদে কারোর-ই পড়া নেই ফেলুদা । যে একজনের পরা তারও কমিকসে ইংরিজি ভাষায়। তবে হুগলি নদীর ওই পাড়ে যে অনেক বড় পশ্চিমবঙ্গ পড়ে আছে সেখানে অনেক বাংলায় ফেলুদা পড়া ছেলেপিলেও কিন্তু হলমুখো হয়েছিল এবারে। বার বার ছবির ইউএসপি করা হয়েছে ৫০ বছর পূর্ণটাকে। তাছাড়া সব্যসাচীবাবুও এবারে উপসংহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তো সব মিলিয়ে কেমন দাঁড়াল এবারের ফেলুদা মানে ডবল ফেলুদা ?
প্রথমেই বলে রাখা ভাল, এবারে এখনো পর্যন্ত আগের বেশ কয়েকবারের তুলনায় ফেলুদা ভালো লেগেছে অনেকেরই। কিছু কিছু বিষয় নিয়ে বেশ খুঁতখুঁতুনি থাকলেও একটা হালকা ভালো লাগা ছড়িয়ে ছিল ছবির সর্বত্র।
এবারে দুটি গল্পকে পুঁজি করে ছবি এগিয়েছে। আগেও এই কায়দা নিয়েছিলেন পরিচালক সন্দীপ রায়, কিন্তু সফল হননি। এবারের গল্প দুটি হল সমাদ্দারের চাবি আর গোলোকধাম রহস্য। সমাদ্দারের চাবি বেশ ছোট একটি কাহিনি। ‘যার নামে সুর থাকে’ সে কি করে সম্পত্তি উদ্ধার করে তার গল্প। আর গোলোকধাম রহস্য হল এক পরাজিত মানুষের প্রতিশোধ স্পৃহার গল্প ।
এবারে শুরুতে ও শেষে সত্যজিৎ স্মরণ ছিল। সেটা মন্দ লাগেনি। বিশেষ করে শেষে নামের তালিকা দেখানোর সময় সাক্ষাৎকার দেখানোর কায়দাটা বেশ ভালো লেগেছে! তবে একটা অভাব খুব চোখে পরেছে তা হল, নীলু, তোপসে, মুকুল রইল আর ফেলুদা রইল না ! একটা সৌমিত্র চট্টপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার বড্ড আশা করেছিলাম।
আর গোটা সিনেমা জুড়ে জায়গা মাফিক সাধ্যমত অভিনয় করে গেছেন ব্রাত্য বসু, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, ভাস্কর চক্রবর্তী, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীরা। তোপসে হিসেবে সাহেবও বেমানান নন। তবে ফেলুদা হিসেবে সব্যসাচী চক্রবর্তীর অভিনয় নিয়ে একেবারেই কোনো প্রশ্ন না থাকলেও সাযুজ্য নিয়ে থেকেই যায়। প্রায় ষাটোর্ধ বেনুবাবুকে সত্যিই কি আর মানানসই লাগছে ? আলাদা করে বলতে হয় পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। তাঁর অভিনয় নিয়ে কোন বলার কিছু থাকে না বেশিরভাগ সময়েই। এবারেও বেশ ভালো, কিন্তু গল্পের মেজাজ অনুসারে সিধু জ্যাঠাকে আর একটু রাশভারী দেখব ভেবেছিলাম। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অভিনেতাই তাকে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন নিঃসন্দেহে, কিন্তু এমনটা হল না কেন জানা নেই। আর বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে রণজিৎ-এর চরিত্রটি। গৌরবের মাপে মাপে অভিনয় চরিত্রটিকে বইয়ের পাতা থেকে তুলে এনেছে বলে মনে হয়েছে বার বার।
আর যিনি ছিলেন গোলোকধামের রহস্যের মূলে সেই অন্ধ বৈজ্ঞানিকের চরিত্রটিতে অত্যন্ত ভাল মানিয়েছে ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়কে। তিনি কোন মানের অভিনেতা তা আবারও প্রমাণ করেছেন এখানে। বিশেষ করে, দোতলা থেকে “কে” জিজ্ঞেস করার পর তার গলার পরিবর্তন অভিনয়ে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
ছবিতে সন্দীপ রায়-সুলভ হাস্যকর কাণ্ডকারখানা কিছু রইলেও মোটের ওপর নিতান্ত মন্দ লাগেনি। বৈজ্ঞানিকের মৃত্যু শয্যায় চাদর বা কম্বলের বদলে গায়ে কাপড়ের কাঁথার ব্যাবহার বেশ ভালো লেগেছে। কিছু ছবির ক্ষেত্রে ‘সময়’ জিনিসটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাকে ভুলে ‘আধুনিক’ করতে গেলে সেই জিনিসের মজাটাই হারিয়ে যায়। এখানেও মোবাইলের ব্যবহার না দেখালেও চলত। আর রাস্তার দৃশ্যগুলিতে নীল সাদা রঙ বড় বেমানান লেগেছে। শুধু শেষ হওয়ার পর একটাই খটকা রয়ে যায়, সমাদ্দার বাবুর নাতির মেলোকর্ডের পেট থেকে পাওয়া অতোগুলো হাজার টাকার নোট নিয়ে এবার কি করবেন! লবেজান হয়ে যাবে ওগুলি ভাঙাতে।
ছবি শেষ হল ‘ফেলুদা ফের ফিরবে’ বলে । ফেলুদা ফিরুক, বার বার ফিরুক। কিন্তু এবার একটু নতুন করে পেলেই ভালো লাগবে।

বিজ্ঞাপন

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here