দঙ্গল – সার্থক মূলধারা

0
44

debarati_guptaদেবারতি গুপ্ত

মোদ্দা কথা হল

মেডেল লানে কে লিয়ে কোই হেল্প নহি করতা…

মেডেল লা নহি পাও তো গালি সব দেতে হ্যায়

আমি দঙ্গল দেখে এই সার কথাটাই (আরো একবার) বুঝে নিয়েছি। আরো একবার লিখলাম কারণ প্রতিটা স্পোর্টস মুভিরই এটাই মূল মন্ত্র। আর লেখাটা ব্র্যাকেটে মোড়া কারণ বেশির ভাগই শুনলাম ছবিটি দেখে নিদান দিয়েছেন যে ভারতবর্ষে আজ অবদি হওয়া শ্রেষ্ঠ স্পোর্টস মুভি এইটেই। অভিব্যক্তির বাকিটা ব্যক্তিগত!

এতদিন ভারতে স্পোর্টসের মতোই (ক্রিকেটকে ‘তুমি তো তেমন আন্তর্জাতিক নও বললে’ যদি কষ্ট পান আমার কিছু করার নেই) স্পোর্টস মুভিও পিছিয়ে থাকা ছিল। সেই খরা কাটিয়ে গেল কয়েক বছরে এই ধারার সিনেমার হিরিক বেশ তুঙ্গে। স্পোর্টস বায়োপিকের মধ্যেই তো চাক দে ইন্ডিয়া, পান সিং তোমার, ভাগ মিলখা ভাগ থেকে শুরু করে হালের মেরি কম, আজহার, বুধিয়া সিং…,  ধোনি হয়ে এই দঙ্গল। দঙ্গল তার জাতের বাকি সবকটি ছবির তুলনায় বেশি চমকপ্রদ, যাকে এক্সটিক বলে। অবিশ্যি এটুকু তো শ্রী সত্যমেব জয়তের কাছ থেকে পেতে অভ্যস্থ আমরা। বয়সের ভারে একসময়ের ধনুকের ছিলাসম পালোয়ানের বিকট ভুঁড়িওলা এডিশন তো ভদ্রলোককে একই অঙ্গে এবং একই সিনেমায় (অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে) ধারণ করতে হয়েছে! এসব কারসাজি আমরা হলিউডে দেখে অভ্যস্থ। চরিত্রের প্রয়োজনে এইভাবে নিজেকে ভাঙা গড়া নিশ্চই কুর্নিশের দাবিদার। তবে কুর্নিশ করার পরেই নিজের ভক্তিবাদী মনকে যদি একটু নির্মল আনন্দ দিতে চান তাহলে জাইরা ওয়াসিমের দিকে চোখ ফেরান এবার। অবশ্য ফেরাতে হবে না,  সে নিজেই স্বতস্ফূর্ত ভাবে আপনার নজর কেড়ে নেবে। জাইরা গীতা ফোগটের ছোটবেলা। যেই আপনি জাইরার দিকে মনযোগ দিতে শুরু করবেন ওমনি আপনার মন নিয়ে টানাটানি শুরু করবে সুহানি ভাটনাগর। গীতার বোন ববিতা ফোগটের ছোটবেলা। যোগ্য সঙ্গত করে যাবে সাক্ষী তানয়ার আর অপরশক্তি খুরানা। এবং ছবি দেখতে দেখতে দু – একটি জায়গা ছাড়া (যেমন আমির খানের কান দুটি) সত্যিই মনে থাকবে না আপনি আমির খানকে দেখছেন। জাইরা আর সুহানিকে বড়োবেলায় আমরা ফাতিমা সানা শেইখ ও সানয়া মালহোত্রা হয়ে যেতে দেখি। এরাও যথার্থ চরিত্রায়নের মাধ্যমে গল্পের উত্তেজনাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে। ওদের চেহারার চাকচিক্য দেখে যদি মনে খিঁচ লাগে তবে সেটা কমার্শিয়াল সিনেমা বলে এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। রেসলিং এর নাটকীয়তার মাঝখানে খান দুই গান একটু বিরক্ত করতে পারে। কী আর করবেন? সেক্ষেত্রেও বলিউড মেইনস্ট্রিম ছবিতে ও একটু আধটু অমন হয় বলে এগিয়ে যেতে হবে। এই ভেবে সহ্য করা ভাল যে মূলধারায় দাঁড়িয়ে আজকাল অনেক কথাই অনেক ছবি বলে দিচ্ছে যা এতদিন বলা হয়নি এবং অবশ্যই বলা দরকার ছিল। তাই পিঙ্ক বা দঙ্গলের মতোন ছবিকে কতটা সিনেমাটিক হল, ছবি হিসেবে উতরোতে পারলো কি না ইত্যাদি না ভেবে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখাই ভাল। দঙ্গলও তেমনি একটা পদক্ষেপ যা বেশ বলিষ্ঠভাবেই নেওয়া হয়েছে। স্পোর্টস মুভি হিসেবে তো বটেই নারীবাদের স্টেটমেন্ট হিসেবেও।

আচ্ছা এটা তো ঘটনা যে বেশিরভাগ মেয়েদেরই ছেলেদের তুলনায় বাইরে বেরোবার জন্য তৈরি হতে বেশি সময় লাগে। চুলের তরিবৎ করে তারপর চোখে কাজল টানতে যে সময় লাগে বেশিরভাগ ছেলের দু বার দাড়ি কামানো হয়ে যায় তাতে। তারমানে দিনের একটা নির্দিষ্ট অংশ আমরা আমাদের মেয়েলিপনার পেছনে খরচ করি। (ভাল না খারাপ; নারীবাদের নিরিখেও কতটা ঠিক ভুল সেটা অন্য প্রসঙ্গ) অর্থাৎ কয়েক হাজার বছরে সমাজের তৈরি করে দেওয়া নারীত্বের চিহ্নগুলো যথাযথভাবে বহন করার আপ্রাণ চেষ্টা করি এবং কখনো সখনো করতে না পারলে মন খারাপেও ভুগি (আমিও এই দলেই, কিঞ্চিত মোটা হয়ে গেলেই বা চুল পড়তে থাকলে দু:খ বাড়ে)। দঙ্গলে খুব সহজ ভাবে এই মেয়েলিপনার গোড়ায় লুকিয়ে থাকা মানসিকতা নিয়ে ঠাট্টা করেছে। এই একই জিনিস পার্চড সিনেমায় দেখেও বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম। এমন একটি সমান্তরাল স্টেটমেন্ট মনোরঞ্জনের মোড়কে মূলধারার বাণিজ্যিক ছবিতে বলতে পারা অবশ্যই কৃতিত্বের। বিশেষ করে যে দেশে এখনো বেবি কো বেস পসন্দ না হলে চলে না সেই দেশে দঙ্গলের প্রয়োজন আছে। একে তো রেসলিং যা কি না ক্রীড়াজগতের প্রান্তিক বাসিন্দা তায় আবার মেয়ে। তাই ছবির শেষ দৃশ্যে যখন সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসা গানটা বেজে ওঠে (ঢুকতে দু – মিনিট দেরি হয়েছিল তাই সূচনায় জাতীয় সঙ্গীতে উঠে দাঁড়াতে হয়নি) আমার মতোন অ্যান্টি ন্যাশনালেরও গলার কাছটা কেমন করে ওঠে। সবার সঙ্গে উঠে দাঁড়াতে গর্ব বোধ হয়। আপনা থেকেই শিড়দাঁড়া টানটান হয়ে যায়। এখানেই দঙ্গলের মতো একটি কমার্শিয়াল ছবির সার্থকতা।

বাকি আর কিছু নয়, আমার এই অভিজ্ঞতার পুরোটাই ব্যক্তিগত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here