রাজ অনুগ্রহপ্রার্থী, সাজেশন মানা ঝকঝকে ব্যোমকেশ

0
114

pritha-editedপৃথা তা :
মাস দুই আগেই ঘুরে গেছে ‘ব্যোমকেশ ও চিড়িয়াখানা’। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই হলে ফের সত্যান্বেষীর হানা ‘ব্যোমকেশ পর্ব’-র মলাট গায়ে । তবে এসব ক্ষেত্রে কিছু দর্শক হন একেবারেই ব্যাক্তি গোয়েন্দার ভক্ত আর কিছু সিনেমার। তাই হলমুখো দর্শক প্রথম দিন উপচে না পড়লেও ভিড় মন্দ হল না। মাল্টিপ্লেক্সগুলির কথা অবশ্য আলাদা। তাছাড়া অরিন্দম শীলের ছবি নিয়েও দর্শকদের আলাদা প্রত্যাশা থেকেই যায়। এবারে সে প্রত্যাশা যে ছোঁয়া যায়নি বললে ভুল হবে, তবে ছবি ‘হিট’ করানোর এত সহজ রাস্তায় না হাঁটলেও পারতেন অরিন্দমবাবু। কারণ প্রথমত, ব্যোমকেশের এই গল্পটির চাল খুবই স্বতন্ত্র। দ্বিতীয়ত, পাশাপাশি আরও একজন ঠিক এই সহজ পন্থা মেনে ব্যোমকেশ হিট করানোর নিদারুণ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। তৃতীয়ত, পরিচালকের লোকেশন বাছাই, বাজেট ও অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়গুলি বারবারই চোখ টানে তাঁর ছবিতে। যাই হোক সব মিলিয়ে বেশ ভোঁতা ভাবে রাজ অনুগ্রহপ্রার্থী, সাজেশন মানা ঝকঝকে ব্যোমকেশ উপহার পাওয়া গেল এবারের শীতে।
‘অমৃতের মৃত্যু’-র মূল ঘটনা হল, একটি অঞ্চলে বেআইনি অস্ত্রের রমরমা শুরু হওয়ার কারণে সরকার থেকে ব্যোমকেশকে তদন্তে পাঠানো হয়, সেখানে গিয়ে হঠাৎ জানা যায় রহস্যজনকভাবে গুলি লেগে একটি নিরীহ ছেলে খুন হয়েছে । ব্যোমকেশ সেখানে থাকার কারণে জড়িয়ে যায় সেই কেসেও। পরে দেখা যায় এখানে অন্য গল্প আছে। কী সেই গল্প জানতে চাইলে হলে যেতে হবে বা এই মাগ্গিগন্ডার বাজারে পয়সার হ্যাঙ্গাম হলে গল্পটি কষ্ট করে পড়তে হবে। তবে সময় বেছে পরিচালকের এই গল্পটিকে নির্বাচন দেখে এবং তাঁর তৈরি করা   ব্যোমকেশের ফাঁদে পা দিয়ে দর্শক হিসেবে খানিক মজা লাগে বৈকি!

ছবির সর্বত্র বিশেষ করে জঙ্গলের দৃশ্যগুলির এক্সট্রিম লং শট মন ছুঁয়ে যায়। উত্তরবঙ্গ বিশেষ করে জঙ্গল বেশ একটি অন্য আঙ্গিকে ধরা দিয়েছে এ ছবিতে।

byomkesh-parbo
ব্যোমকেশ, অজিত, সত্যবতী নিজেদের ভুমিকায় বেশ ঠিকঠাক। আধ-পুরনো গিন্নির ভূমিকায় সোহিনীকে বেশ মিষ্টি লেগেছে। ঋত্বিকের এখানে মারাত্মক কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা না হলেও আগেরবারের থেকে বেশ দরকারি জায়গায় দেখা গেছে তাঁকে। তাঁর অভিনয় নিয়ে বেশি কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্যোমকেশও ঠিকঠাক। কৌশিক সেন, জুন, রজতাভ দত্ত, রুদ্রনীল ঘোষ, সুপ্রিয় দত্ত, অশোক সিং, পদ্মনাভ দাশগুপ্ত, মীর নিজেদের ভূমিকায় বেশ মানানসই। অনেকদিন পরে একটি সিরিয়াস চরিত্রে দেখা গেল শুভাশিস মুখার্জিকে। দক্ষ অভিনেতাকে বারবার স্থূলরুচির মজার চরিত্রে কাজ করানো হলেও এমন সুযোগ যত বার পেয়েছেন তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
তবে গনিকাপল্লির দৃশ্যটি মাত্রা ছাড়া বড়ো করা হয়েছে। হয়তো দর্শক টানার কৌশল হিসেবেই। কিন্তু সায়ন্তনীর নাচটি একেবারে অপ্রয়োজনীয় লেগেছে। ভীষণ মাত্রাজ্ঞানহীন ও কুরুচিকর লাস্যের প্রয়োগে মুজরো বা মেহফিল জমাতে একেবারে ব্যর্থ হয়েছে। জোর করে কোমরের আড়ালে সত্যান্বেষীর লুকোচুরির দৃশ্য না দেখিয়েও এ ছবিকে বেশ বাজার চলতি করতে পারতেন পরিচালক। যাদের কথা ভেবে এই ‘ঠুমকা’ সংযুক্ত করার পরিকল্পনা, তারাও এটি কতটা উপভোগ করেছে, তা ভাবার বিষয়। এই ছবিতে মারামারির দৃশ্যগুলির জন্য ব্যোমকেশ তথা আবিরকে বিশেষ ট্রেনিং নিতে হয়েছিল, শিখতে হয়েছে আলাদা করে ঘোড়ায় চাপাও। মুম্বই থেকে লোক আনিয়ে বিশেষ অ্যাকশনের দৃশ্যগুলি তোলা হয়েছে। সেগুলি হয়েওছে বেশ মনোগ্রাহী। বিশেষ করে বম্ব ব্লাস্ট-এর দৃশ্যটি বেশ ভাল। আতরের শিশি দেখে তার ইতিহাস অনুমান করার অংশটি শার্লক হোমসের শেষ সিরিজের কথা মনে করিয়ে দেয়। গল্পের মাঝে মাঝে মহাকাব্যের টুকটাক সূত্র অবশ্য খুব বেশি অন্যমাত্রা যোগ করেনি ছবিতে।
সৌমিক হালদার ছবিতে ক্যামেরার কাজ করেছেন। বেশ ভাল লেগেছে কিছু দৃশ্য।
আলাদা করে বলতে হয় এই ছবির মিউজিকের কথা। বিক্রম ঘোষ দুরন্ত কাজ করেছেন এবারেও। বিশেষ করে ঘোড়সওয়ারের দৃশ্যগুলিতে তার সৃষ্ট আবহ অন্য মাত্রা যোগ করেছে, মনে পড়ে গেছে শোলের হেমা মালিনীর সেই ঘোড়ার গাড়ির বিখ্যাত দৃশ্যের আবহে বাজতে থাকা দুরন্ত তবলার বোল।
‘খোল দ্বার বঁধুয়া’ গানটির চরিত্রায়ন বেশ নাটুকে লেগেছে। জুনকেও এই দৃশ্যে কৃত্রিম লেগেছে বেশ।
সবই তো চলছিল বেশ নিজের তালেই কিন্তু ব্যোমকেশের মুখ দিয়ে রাষ্ট্রের চোখে ‘রাখাল’দের‘গোপাল’ হওয়ার পরামর্শ দিয়ে জ্ঞানের বাণী না দিলেই ভালো হত এবং এই স্বাধীনতা যে কাম্য নয়, যারা এই দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিল সেদিন, তাঁরা যে ‘দুষ্টু-লোক’, তা অরিন্দমবাবু দর্শককে মাথায় পেরেক মেরে বোঝানোর দায় কেন নিলেন কে জানে!

পরিশেষে স্বাধীনতার মহানুভবতা সম্পর্কে এবং ‘খুনের রাজনীতি’ সম্পর্কে ব্যোমকেশ সুচিন্তিত মতামত দান করে।  স্বাধীন ভারতে অশিক্ষায়, অনাহারে, বিনা চিকিৎসায়, রাজদ্রোহে মারা যাওয়া প্রতিটি প্রাণ সম্পর্কে সত্যান্বেষীর কী বক্তব্য, তা অবশ্য দর্শকদের জানতে দেননি পরিচালক। তারপর স্বাধীনতার প্রথম বর্ষপূর্তিতে ছোটো ছেলেপিলে সহযোগে আবেগঘন ভাবে পতাকা তোলেন ব্যোমকেশ, সেই সময় আবহে জাতীয় সঙ্গীত বাজেনি, বেজেছে বন্দেমাতরম। অসুবিধে হয়নি তাতে, জাতীয় সঙ্গীতের কসরত দেখানোটা তো এখন হল মালিকের দায়িত্বে আছে।
খোদ পরিচালক মশাইকে পর্দায় দেখা যায় সরকারি অফিসার হিসেবে, মুখ্যমন্ত্রীর চা-আসরে ব্যোমকেশকে নিমন্ত্রণ জানাতে।
যাইহোক, একটি সামান্য খটকা থেকে যায়, প্রথমত, যিনি এই স্বাধীনতায় বিশ্বাস না করে চরমপন্থার আশ্রয় নিয়েছেন তার ব্যক্তি জীবন অতো বিলাসের হয় কী করে ? দ্বিতীয়ত, কলকাতা থেকে ফেরার সময় বাইরে বৃষ্টি হলেও ব্যোমকেশ একদম খটখটে শুকনো হয়ে ফেরে কী করে ? তৃতীয়ত, নাচের সময় সাঁওতাল মেয়েরা মাথায় কর্নফ্লাওয়ার ফুলের মালা লাগাতো নাকি স্বাধীনতার সময়! এত বাজেটের ছবিতে কটা রুপোলি কাঁটা বা গাঁদা ফুলের মালা জোগাড় করা যেতো না ?
যাইহোক, নিজ-ঢঙে ব্যোমকেশকে আবার পর্দায় আনলেন অরিন্দম। দেখা যাক, এবারেও তাঁর পুরোনো বাণিজ্যিক খ্যাতি বজায় থাকে কি না!

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here