Search

পাকিস্তান থেকে বস্তার। যুদ্ধের ঘর ও বাহির: দুটি নতুন বই

পাকিস্তান থেকে বস্তার। যুদ্ধের ঘর ও বাহির: দুটি নতুন বই

nilanjan-duttaনীলাঞ্জন দত্ত

‘হানিমুন’ শব্দটার একটা বৈবাহিক অর্থ আছে, আর একটা কূটনৈতিক। প্রথমটার মানে বিয়ের পর বেড়াতে যাওয়া, আর দ্বিতীয় অর্থে দুই দেশের সম্পর্কের মধুর মুহূর্ত। এই দুই অর্থ মিলে যাওয়ার উদাহরণ বিরল। সাংবাদিক ও শান্তিকর্মী শুভাশিস চট্টোপাধ্যায়ের জীবনে এই আশ্চর্য সমাপতন ঘটেছে, যার আখ্যান ‘আলবিদা পাকিস্তান’ বইটি (দা কাফে টেবল, কলকাতা, ১৫০ টাকা)। অবশ্য, দ্বিতীয় অর্থটি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য দুই দেশের সরকারের সুসম্পর্কের প্রেক্ষাপটে নয়, দুদেশের জনগণের সৌভ্রাতৃত্বের প্রেক্ষিতে।

বিয়ের ১৬ দিনের মাথায় শুভাশিস আর পারমিতা কলকাতা থেকে করাচির উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন আরও বেশ কিছু চেনা-অচেনা সঙ্গী সহ, উপলক্ষ ছিল ১২-১৫ ডিসেম্বর ২০০৩ সেই বন্দর নগরীতে ‘পাকিস্তান-ইন্ডিয়া পিপলস ফোরাম ফর পিস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি’ বা শান্তি ও গণতন্ত্রের জন্য পাক-ভারত গণমঞ্চের ষষ্ঠ যৌথ সম্মেলনে অংশগ্রহণ।

সেখান থেকে ফিরে এসে শুভাশিস একটি বই লেখেন, নাম ছিল ‘হৃদয়ে কাঁটাতারের বেড়া’। তারই পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ বেরোলো এবার, ‘আলবিদা পাকিস্তান’ নামে। বেরোলো এমন একটা সময়ে, যখন “দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে করমর্দন, আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ”, এসব পেছনে চলে গিয়ে বড় হয়ে উঠেছে “সীমান্তে উত্তেজনা, সন্ত্রাসবাদী হানা, রক্তপাত, মৃত্যু, কান্না আর অবিশ্বাস”। তবুও শুভাশিসের প্রশ্ন, “একযুগ আগে পাকিস্তানে গিয়ে যে ভালোবাসা আর আতিথেয়তা পেয়েছিলাম তা প্রাণ থাকতে ভুলি কী করে?”

করাচি প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের এক যৌথ সভার কথা তিনি লিখেছেন। যেখানে একটা প্রশ্ন উঠেছিল। “দু’দেশের সাংবাদিকরাই একমত হলেন, যুদ্ধ বা দেশ আক্রান্ত হলে তাঁরা সবাই জাতীয়তাবাদী হয়ে যান। কিন্তু শান্তির সময় তাঁরা তো দু’দেশের মানুষের মধ্যে আরও সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে পারেন?” আসলে তা হয় না। কাগজে দুয়েকটা পোস্ট-এডিট বা টিভির টক শোতে দুয়েকটা মন্তব্য বাদ দিলে সাধারণত মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশনের ভঙ্গিতে এর উল্টোটাই বরং বেশি দেখা যায়। এমনকি, খেলার খবর পরিবেশনেও সবসময় যুদ্ধের অনুষঙ্গ। কই, ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলার সময় তো তা হয় না ?

অথচ, “নঈমউলের দাদা বললেন, ‘কিঁউ কি সাস ভি কভি বহু থি’ সিরিয়ালটা পাকিস্তানে খুব জনপ্রিয়। সে সময় নাকি কেউ টিভি ছেড়ে ওঠে না। … নঈমউলের ছোট ভাইয়ের আবার সিনেমা টিনেমার উৎসাহ নেই। সচিন, সেহবাগ, রাহুল দ্রাবিড় আর সৌরভকে নিয়েই তার আগ্রহ।”

সম্মেলনের প্রতিনিধিরা কে কী বলেছেন, তার বিবরণের চাইতে বইটিতে ছড়িয়ে থাকা এরকম বহু অখ্যাত মানুষের ছোট ছোট কথা অনেক বেশি ভাববার মতো। কূটনীতির ভাষায় দুই দেশের সরকারের মধ্যে সম্পর্ককে বলা হয় ‘ট্র্যাক ওয়ান’, আর জনগণের মধ্যে সম্পর্ককে বলা হয় ‘ট্র্যাক টু’। আসলে বোধহয় উল্টোটাই বলা উচিত।

কিন্তু, লেখকের উপলব্ধি, “দুঃখের হলেও সত্যি দু’দেশেই শান্তি-প্রস্তাবের পক্ষে মানুষজন সংখ্যালঘু।” তাই কী ? বরং দুই দেশেই বেশিরভাগ মানুষ শান্তি চান, কেবল জোর দিয়ে সে কথাটা বলতে পারেন না। আর নিজেদের মধ্যে যোগাযোগও যাতে রাখতে না পারেন, তার জন্য ক্রমশই মজবুত হচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া। এখন আবার শুনছি, ইজরায়েলের সহযোগিতায় নাকি বসানো হবে আরও “উন্নত” কাঁটাতার, যেমন রয়েছে গাজার সীমান্তে।

শুভাশিসের বইয়ের মলাটের ওপর দিয়েও চলে গেছে কাঁটাতারের বেড়া। ভারত-পাকিস্তানের সীমানা বোঝাতে শিল্পীর স্বাভাবিক অবলম্বন। কিন্তু সমস্যাটা হল অন্য জায়গায়। পুজোর মধ্যে, যেদিন এই বইটা রিভিউর জন্যে পেলাম, সেদিনই ‘অল ইন্ডিয়া পিপলস ফোরাম’-এর অমলেন্দু চৌধুরী “আমাদের এই রিপোর্টটা বেরিয়েছে” বলে আর একটা বই হাতে ধরিয়ে দিলেন। বইটার নাম – ‘বস্তার’।

কী আশ্চর্য, এর মলাটেও সেই কাঁটাতার! এখানে কিসের সীমান্ত? উপশিরোনামে লেখা আছে, “হোয়্যার দা কনস্টিটিউশন স্ট্যান্ডস সাসপেন্ডেড”। রিপোর্টে বলছে, সংবিধানের সুশীল শাসন এখানে চলে না, এখানে আধা-সামরিক বাহিনীর বুট-বেটন-বন্দুকের শাসন। যুদ্ধ তাহলে শুধু বাইরে নয়, ঘরেও?

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন