Search

শীত আসছে

শীত আসছে

papya_mitraপাপিয়া মিত্র :

মায়ের আদরের মতোই গায়ে লেপটে আছে শীতের চাদরখানা। নকশিকাটা র‍্যাপারের নিবিড় পরশ নিতে সে আসছে গুটিগুটি পায়ে। হেমন্তের বাতাসে বার্তা খানিক রটেছে বটে, তবুও এই আগমন যেন কিছুটা ধীর। মমতাময়ী মায়ের মতো অপার করুণা বর্ষণ করতে করতে তার পদ-সঞ্চালনা।

মাঠে মাঠে ধান কাটার প্রস্তুতি চলছে। আসন্ন ফসল জন্ম দেওয়ার আনন্দে পোয়াতি ধানগাছগুলো আরও একবার দুলে উঠছে তিরতিরে উত্তুরে হাওয়ায়। ভোরের রোদ ধানক্ষেতে মাথা পেতে শুয়েছে। দূষণ গিলেছে প্রকৃতি, তাই শিশির পড়ুক কিংবা নাই পড়ুক এখন হেমন্ত। নবান্নের প্রস্তুতি গ্রামে-গঞ্জে। কার্তিকের মিঠে রোদে যে ছড়া বেঁধেছিল ভোলা, তার সুর দেওয়া হল না এই অঘ্রানেও। ভোলার অবসর বেশি নয়। ভালোবাসার আহ্লাদে অলস সময় শুধু ছড়া কাটে আর সুর দেয়। কিন্তু সে সব এখন চুলোয় গিয়েছে এই হেমন্তের সকালে।

এই হেমন্তে আমজনতার সকাল থেকে রাত কাটে এক চিন্তায়। ভোলাকে সকলেই গাইয়ে বলে জানে। এখন নায়ক। ‘নোটের আমি নোটের তুমি নোট দিয়ে যায় চেনা’। হেমন্তের এক মধ্যরাত সবাইকে এক চাদরের নীচে শুইয়ে ছেড়েছে। এক ধরনের গরম নিজের মধ্যে বেশ অনুভূত হয়। কাউকে জানানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু মনে হয় হাওয়ায় ভাসছি। পথচলতি মানুষ শুধিয়ে যায় ‘আছে নাকি?’ বাবু কালচারে শীত এখন পগারপার। কিন্তু যারা সারা জীবন শীতকে উপভোগ করে এসেছে ভোলা তাদেরই একজন। এই হেমন্তের শেষ বিকেলের রোদটুকু নিকিয়ে তোলে মনের কোঠায়। তাই চায়ের দোকানে আগেভাগেই চলে আসে। এখানেই হরেক গপ্পো।

দোকানের ছাই সরিয়ে ঘুঁটে সাজিয়ে কয়লা ঢালে নেপুদা। আগুন লাগিয়ে শুকনো সুপুরিপাতা গুঁজে দেয় নীচে। হাতলভাঙা পাখাটি দিয়ে পতপত হাওয়া মারে। শীত পড়ছে, কুয়াশা নামছে। ধোঁয়া কুণ্ডলি খেয়ে পাক দেয় ভোলার শরীরে। তর সয় না। গুনগুন গান ভাঁজে। ৫-১০-এর লোকাল এসে গেল। স্টেশনচত্বরের সবজি-মাসি-মেসোরা হাঁকাহাঁকি শুরু করে। ভোলার মন নেচে ওঠে। চায়ের দোকানে আরও ভিড় বাড়বে, নাপিত-নেতার নোটগপ্পো আরও শোনা যাবে। এক থলি উছলে পড়া সবজি নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির পানে ছবিদি। ভোলাকে দেখতে পেয়ে ঝাঁঝিয়ে যায়, মুখপোড়া সুজ্জিটাকে ধরে রাখতে পারলিনি? মুখপোড়াই বটে ভোলা। ধরে রাখতে পারল না জমিজিরেতটুকু।

শীতের রোদ, আহা। মনে পড়ে যায় সেই সব রোদকথা। তখনও গাইয়ের চাদর গায়ে ওঠেনি। শীতের নরম রোদ দেখতে ঠাকুরদার হাত ধরে ক্ষেতে যেত ভোলা। ঝিলিক দিয়ে উঠত বেগুন-সিম-পালং। খিলখিল করে হাসত ফুলকপি, মুলোশাক আর পেঁয়াজকলি। রোদের চলন দেখে ঠাকুরদা সময় গুনতেন। ঘরে ফিরে দেখত ততক্ষণে ঠাগমা বাটা কড়াইডালের গামলিতে হাত ঘোরাচ্ছে। মুখে ঠোসা পান নিয়ে ছুটতেন দক্ষিণের উঠোনে। ভোলার দুপুরের ভাত খাওয়া হলে তার দায়িত্ব বড়ি পাহারা দেওয়ার। এক এক সময় ঠাকুরদার পরনের ধুতি কিংবা চানের গামছা উধাও হয়ে যেত। দু-তিনদিন পরে গরমজলে সে সব ফুটিয়ে কাচা হত। শুকোনোর দায়িত্ব ছিল ভোলার। যখন ঠাকুরদা হাটে যেত সবজি বেচতে, ঠাগমা মাপ করে করে কাপড় গামছা কেটে রাখত। ভোলার ঠাগমার হাতের বড়ির খুব চাহিদা ছিল। সেই কাপড়ে ফের বড়ি পড়ত রোদে।

বাপ-মাকে কবে হারিয়েছে মনে করতে পারে না ভোলা। শীতের উঠোন অনেক কথা আজ শুনিয়ে চলেছে। সার্কাসমাঠে তাঁবু পড়েছে। ছেলের দল সার্কাস দেখতে যাবে। রিং-মাস্টারের পাশে পাশে থাকত যে মেয়েটা, তাকে দেখে এক দিন সিটি মেরেছিল ভোলার দলের ছেলেরা। দল ছাড়ল, বড়ির থলি নিয়ে পা বাড়াল স্টেশনপথে। সেই যে বারে সুনামি এল, তছনছ হল সুন্দরবন! ঠাগমা-ঠাকুরদাকে বছরের মধ্যে হারিয়ে দিশেহারা ভোলা সারা দিন ধরে শুধু ছড়া কাটে আর গান গায়। নতুন পথের পথিক সে। গানে-ছড়ায় বেশ কাটে। ছড়া কাটে কমলা-পানিফল-কুল নিয়ে। গানে গলা ছাড়ে ফুল-পশম-দেবতা নিয়ে। ট্রেন আসে, ট্রেন যায়। জলপাইয়ের আচারের গন্ধ সরে যায়। উঠোনে শক্ত হয় শীত-উৎসবের মাঞ্জা। ধীরে ভরে ওঠে ফতুয়ার পকেট।

ভোলা চোখ কচলিয়ে দেখে মাদুর পেতে শীতের রোদে ঠাগমা-ঠাকুরদা শরীরটাকে সেঁকে নিচ্ছেন। রাতমাঝে হরিধ্বনি, কে গেল? ভোররাতে উলুধ্বনি, কার বিয়ে লাগল? ভোলার বারান্দা নেই, ছিল বেশ বড়োসড়ো এক উঠোন। সেখানে এক আকাশ রোদ্দুর সারা দিন আপনমনে খেলা করত।

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন