Search

পুজোর ভোগ থেকে বিপর্যয়ের আহার

পুজোর ভোগ থেকে বিপর্যয়ের আহার

papya_mitraপাপিয়া মিত্র  

খিচুড়ি শব্দটা শুনলেই মনে হয় সব যেন গণ্ডগোল হয়ে গেল। হবে নাই-বা কেন? সেই তো কবেকার কথা। বড়োদের ফেলে রাখা কাজে হাত দেওয়া মানেই খিচুড়ি পাকিয়ে দেওয়া আর পিঠে দুমদুমাদুম পড়া। কিন্তু এই শব্দটাই যে আমাদের কত বিপদ থেকে মান বাঁচিয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। সব শ্রেণির অন্দরে এই শব্দের নানা ধরনের আপ্যায়ন। তাই ধোঁয়া ধোঁয়া ঝড়বাদলে এর উপস্থিতি ঠিক মুশকিল আসানের মতো।

বাসি-টাটকা, পাতলা-চাপচাপ, কাজুকিসমিস-আলুপেঁয়াজ, মশলাযোগে না মশলাহীন ডালচাল সেদ্ধ – সে যে কী মনোরম স্বাদে-আহ্লাদে রাত্রি যাপন করিয়ে দিত তা আজ ভাবলে বড়ো মন খারাপ হয়ে যায়।

আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে-এর জীবন মানে সেই কিশোরীবেলার কথাই ধরি। মাসির বাগানে পিকনিকের কথা খুব মনে পড়ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছুটির সময় দেখতাম ডেকচিতে ছোলা সেদ্ধ করে এক দাদু বিক্রি করতে আসতেন। বাড়ি ফিরতেন দুপুর আড়াইটের পরে। আমরা কয়েক জন বেশ গল্প জুড়তাম দাদুর সঙ্গে। এখনকার মতো আমাদের সময় শনিবার ছুটি থাকত না। হাফ ছুটি হওয়ার পরে দাদুর পিছু নিলাম এক দিন। খুব কৌতূহল, কে কে আছে, কে ছোলা সেদ্ধ করে দেয়, দাদুর ঘর কেমন ইত্যাদি ইত্যাদি। চার জন পাশাপাশি বসতাম বেঞ্চে, এক দিন দাদুর পিছন ধরে ঘরে এলাম। এসে তো চোখ ছানাবড়া। এ তো আমাদের মাসির বাগান! চারধারে ফুলের বাগান, তার মাঝে টালির এক চিলতে ঘর। ঘর লাগোয়া একটু মাটির দাওয়া। সেখানেই মাটিতে পাতা উনুন। ডালপালা জ্বাল দিয়ে রান্না হয়। সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে পুণ্যসলিলা গঙ্গা। পটে আঁকা যেন এক ছবি। দাদুর যে এটাই বাড়ি জানব, কী করে? আমরা যখন বিকেলে খেলতে আসতাম তখন দরজা বন্ধ করে দাদু ঘুমোতেন। মাসি চুপ করে বসে খেয়া পারাপার দেখতেন। কোনও দিন জানতে পারিনি দাদুরও বাড়ি এটা। এক নিমেষে দাদু কেমন মেসো হয়ে গেল।   

শনিবারের বিকেল, ওপার থেকে ধেয়ে আসছে বৃষ্টি। মাসি তাড়াতাড়ি আমাদের রান্নাবাটি তুলে দাওয়ায় রাখলেন। বৃষ্টির সুবাস বাতাস আমাদেরকে ভিজিয়ে তুলল। আকাশের কান্না শুনে দাদু থুড়ি মেসো গালে পান দিয়ে দাওয়ায় এসে দাঁড়ালেন। আমাদের অবস্থা দেখে উনুনে জ্বাল দিতে বসলেন। উনুনের মাথায় চাপল সেই ছোলাসেদ্ধর ডেকচি। মাসিকে চালডাল দিতে বললেন। সেই মেসোর তৈরি খিচুড়ির স্বাদ আজও অমৃতসমান। ভোরবেলা যে খেলার সাথি, ছিল আমার কাছে/ মনে ভাবি তার ঠিকানা তোমার জানা আছে…। সেই সাথি সে দিন আমাদের চার জনকে ছোলাসেদ্ধ দেওয়ার শালপাতা কাঠি দিয়ে জুড়ে থালা তৈরি করে গরম খিচুড়ি খাইয়েছিলেন। কী ছিল তাতে? দু’টুকরো আলু ছাড়া কিছুই নয়। সঙ্গী ছিল ভিজে সপসপে ফ্রক, মাসি-মেসোর স্নেহের খিচুড়ি আর বাড়িতে মায়ের কাছে বকুনির ভয়।

সেই অনুপম খিচুড়ির কথা আজ বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে। সারা দিন রিমঝিমঝিম বৃষ্টির আমেজ আবাহন করছে সেই পুজোমণ্ডপে সকলের সঙ্গে খিচুড়িভোগ খাওয়ার আনন্দ। আহা, মণ্ডপে কাঁসর-ঢাকের শব্দ বন্ধ হলেই বুঝতাম এ বার ভোগের লাইন পড়বে। দে-দৌড়। না, কোনও লজ্জা ছিল না। সেই বাসি হয়ে যাওয়া দৃশ্য আজ ডেকচি উপচে আহ্লাদিসুখ হয়ে পরম অন্ন রূপে মুখে উঠছে। আজ সেই সব নামীদামি খিচুড়ির নাম নেব না। রাস্তায় যেতে আসতে নানা মন্দিরের বার-তিথির যে সোনালি উপাদেয় খাবারটি শালপাতার বাটিটিকে আরও মোহময় করে তোলে, সে আমার সেই শৈশবের মাসির বাগানের মেসোর তৈরি খিচুড়ি। বয়ে যাওয়া গঙ্গায় ছেলে হারিয়ে আমাদের খেলার অভিভাবক ছিলেন মাসি। আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার/ দিনের আকাশ মেঘে অন্ধকার।

এক থালা খিচুড়িতে জেগে আছে শুধু আলু, এটাই তো বিপর্যয়ের মহামূল্যবান আহার। কোথাও রাস্তা খোঁড়ার জন্য মানুষ ঘরবন্দি, কোথাও বা বিপদসীমা ছুঁয়ে চলেছে অবিরাম ধারাপাত। সেখানে আলুর অনুপস্থিতিতে শুধু হাতা-বালতির ঠোকাঠুকি। এমনই এক বর্ষার রাতে গরম গরম খিচুড়ি সবে পাতে পড়েছে। মুখে তুলতে গিয়ে জানলার দিকে চোখ পড়তেই দেখি দু’টো কী জ্বলজ্বল করছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি এক মূর্তিমান দাঁড়িয়ে। পিসির ভয়ের চিৎকার আজও মনে আছে। সাহসের ডানায় ভর করে এগিয়ে যেতেই মাকে বলে উঠল, ‘গরম ওইটা দাও না।’ জট পরা ভিজে চুল আর ভিজে কাপড় ঝোলার ভ্যাপসা গন্ধ নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে সেই বুড়ো মানুষটি কী পরম তৃপ্তিতে যে খিচুড়িটুকু এক নিঃশ্বাসে খেয়েছিলেন আজ মনে হয় সোনালি আহার্যের আরও এক নাম পথের বন্ধু। সে দিনও কিন্তু আলু সঙ্গ পায়নি।  

যৌথ সংসারে হেঁশেল পর্ব মিটিয়ে সবে বিছানায় গা এলাতেই কলিং বেল বেজে উঠল। মেজো খুড়শাশুড়ির মামাতো ভাইয়ের ছেলে ও বউ এসে হাজির। নতুন বিয়ে হয়েছে। প্রণাম সারতে এসেছে। ঘুমের দফারফা। রাতের খাবারে যত্নআত্তি তোলা থাক। ঐতিহ্যময় চালডালের ভালোবাসার পরশ শাশুড়ির শ্বশুরবাড়ির মান রেখেছিল।  

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন