নগদহীন অর্থনীতি: চাক্ষুস অভিজ্ঞতা যে অন্য কথা বলছে

0
53

wrivuশ্রয়ণ সেন:

ক্যাশলেস ইন্ডিয়া তৈরি করা যে খুব কঠিন একটা ব্যাপার, বৃহস্পতিবার খড়গপুর আইআইটিতে সে কথা বলেছেন গুগুলের সিইও সুন্দর পিচাই। বলেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জঁ তিরোল প্রেসিডেন্সি কলেজের ২০০ বছর উপলক্ষে আয়োজিত আলচনাসভায়।

পিচাই বলেছেন, ১৩০ কোটি মানুষের দেশে মাত্র তিরিশ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট পরিষেবা এখনও ঠিকঠাক পৌঁছোয়নি। নগদহীন অর্থনীতি গড়তে গেলে আগে পরিকাঠামোর উন্নতি জরুরি। জঁ তিরোল বলেছেন, ভারত গরিব দেশ। গরিব মানুষকে আঘাত করে যেন ক্যাশলেস অর্থনীতি চালু করা না হয়।

গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল পরিষেবার অবস্থা যে কতটা তথৈবচ সে অভিজ্ঞতা চাক্ষুস করলাম বর্ষশেষে মহারাষ্ট্রের কিছু এলাকা ঘুরে। 

জায়গাটির নাম পানশেট। পর্যটন মানচিত্রে তেমন পরিচিত জায়গা না হলেও, পুনে আর মুম্বইবাসীদের কাছে সপ্তাহান্ত কাটানোর একটা ভালো গন্তব্য। দূরত্বও বেশি নয়। মুম্বই থেকে ২০০ আর পুনে থেকে মেরেকেটে ৪০ কিমি।

মহারাষ্ট্র পর্যটনের রিসোর্টে চেক-ইন করে মধাহ্নভোজ করার সময়ই প্রথম ঝটকা খেলাম। বিল মেটানোর জন্য কার্ড বের করেছি, রেস্তোরাঁর ম্যানেজার খুব করুণ মুখ করে বললেন, “এখানে তো কার্ড চলে না, আপনাকে ক্যাশেই দিতে হবে।”

সেকি! প্রধানমন্ত্রী নিজে গোটা দেশকে নগদহীন হওয়ার ডাক দিয়েছেন, অথচ যে রাজ্যে তাঁর দল বিজেপিই শাসক, সেই রাজ্যে এই অবস্থা! আবার এমন একটা জায়গায় যা কিনা শহরাঞ্চলের একেবারে নাকের ডগায়।

কার্ড সোয়াইপ মেশিন থাকা না-থাকার চেয়েও বড়ো কথা হল কাছাকাছি দু’টো বড়ো শহর অথচ এখানে মোবাইল নেটওয়ার্কই এসে পৌঁছোয়নি, তা সে বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলো পাহাড়ে-জলে-মরুভূমিতে-অন্তরীক্ষে নেটওয়ার্ক পৌঁছে দেওয়ার যতই দাবি করুক না কেন। পুনের দিকে অন্তত কয়েক কিলোমিটার এলে পরে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়।

পানশেটের এমন অবস্থা দেখে ধারণা হয়ে গিয়েছিল পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে থাকা ভিমাশঙ্করে কোনো ভাবেই নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না, এবং সেটাই হল। নেটওয়ার্ক না থাকার ফলে গাড়ির চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে কী বিস্তর সমস্যার মুখে পড়েছিলাম সেটা আমরা বা ভিমাশঙ্কর বেড়াতে আসা পর্যটকরাই বুঝবেন।  

পানশেট বা ভিমাশঙ্কর গ্রামীণ হলেও শহরাঞ্চলের ছোঁয়া তাদের লেগে রয়েছে। পানশেটের কথা আগে বলেছি, ভিমাশঙ্কর কিন্তু পুনে থেকে একশো, নাসিক থেকে দেড়শো আর মুম্বই থেকে মাত্র দু’শো কিলোমিটার। বিভিন্ন নেটওয়ার্ক পরিষেবা সংস্থার দাবি অনুযায়ী এই তিন শহরেই ৪জি পৌঁছে গিয়েছে।

মহারাষ্ট্রেই যদি এই অবস্থা হয় তা হলে উত্তরপূর্বের প্রত্যন্ত এলাকা বা কাশ্মীর-হিমাচল-উত্তরাখণ্ডের গ্রামগুলোর কী অবস্থা, যেখানে শীতকালে তুষারপাতের ফলে মানুষের নড়াচড়াই মুশকিল হয়ে যায়। থর মরুভূমি বা কচ্ছের রণে বসবাসকারী মানুষদেরই বা কী অবস্থা সেটা কি কেউ কখনও ভেবে দেখেছেন! অত দূরে যাই কেন, ঘরের কাছে সুন্দরবন চলুন, সেখানেও একই অবস্থা।

কয়েক দিন আগে কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করে, দেশের গ্রামীণ জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ মানুষই নাকি ডিজিটাল লেনদেনে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তার কোনো প্রমাণ আছে কি? পরিসংখ্যান বলছে, দেশের গ্রামীণ জনসংখ্যার ৬৮.৯ শতাংশ মানুষ সাক্ষর। তা হলে আমাদের এটা মেনে নিতে হবে যে ১.৯ শতাংশ মানুষের অক্ষর জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও মোবাইল জ্ঞানলাভ হয়েছে। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

আরও পড়ুন গ্রাম-ভারতের ৭০% মানুষ ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হয়েছেন, দাবি কেন্দ্রের

ডিজিটাল লেনদেনের একটি প্রধান উপকরণ স্মার্টফোন। অথচ পিচাইয়ের কথাতেই শোনা গিয়েছে, দেশের প্রায় একশো কোটি মানুষের হাতে সেই ফোন নেই। তাই স্মার্টফোনের দাম অনেক কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন পিচাই, যাতে অধিকাংশ মানুষের হাতেই তা পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু স্মার্টফোন হাতে এলেই কি সব মিটে গেল? ইন্টারনেট পরিষেবার ব্যাপারটাও তো মাথায় রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রেও সুন্দর পিচাইয়ের খড়গপুর ভ্রমণের একটা উদাহরণ তুলে ধরতে হয়। আইআইটির ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সুন্দর পৌঁছে গিয়েছিলেন খড়গপুর গ্রামীণ থানার অন্তর্গত প্রত্যন্ত গ্রাম গোকুলপুরে। এখানে এসে সুন্দরকে শুনতে হয় এক অপ্রিয় সত্য কথা।

গ্রামীণ এলাকার মানুষদের ইন্টারনেট ব্যবহারে পারদর্শী করতে গুগুলের তরফ থেকে নিযুক্ত স্মৃতিলেখা জানা পিচাইকে বলেন, “ইন্টারনেট শেখাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু এখানে ইন্টারনেট পরিষেবা পাওয়া দুষ্কর।” স্মৃতিলেখা জানান, এই গ্রামে ৩জি, ৪জি দূরের কথা, ২জি স্পিড পাওয়াও কঠিন হয়ে যায়। অথচ ডিজিটাল লেনদেনে অন্তত ৩জি স্পিডের ইন্টারনেট পরিষেবা থাকতেই হবে।  

এর পর আমাদের ভাবতে হবে গরিব মানুষদের কথা। তাদের কাছে নগদহীন অর্থনীতি কতটা সুবিধাজনক। একটু তলিয়ে ভাবলে দেখা যাবে নগদ ছাড়া লেনদেনে গরিব মানুষের কোনো লাভ তো হবেই না, উলটে লোকসান হবে। কারণ ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডে লেনদেন করলে ব্যাঙ্কের তরফ থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়। অর্থাৎ নগদহীন অর্থনীতিরও একটা বিশেষ খরচ রয়েছে। এই প্রসঙ্গেই ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় উদাহরণ হিসেবে বলেছেন, পাঁচ টাকার মুড়ি কিনে যদি কার্ডে টাকা মেটাতে হয়, তা হলে দেখা যাবে ব্যাঙ্কের তরফ থেকে আরও দু’ টাকা কেটে নেওয়া হল। তা হলে মোদ্দা কথা কী দাঁড়াল? পাঁচ টাকার মুড়ি কিনতে গিয়ে খরচ হল সাত টাকা। হ্যাঁ, টাকাটা পকেট থেকে বেরোল না ঠিকই, কিন্তু অ্যাকাউন্ট থেকে তে গেল। গরিব মানুষের কাছে কিন্তু এই বাড়তি দু’টাকার মাহাত্ম্য অনেক।

সুতরাং নগদহীন অর্থনীতি গড়া একটা দেশের সরকারের কখনোই প্রাধান্য হতে পারে না। নগদহীন অর্থনীতির কথা পরে ভাবা যাবে, আগে তার জন্য সঠিক পরিকাঠামো তৈরি এবং তারও আগে গরিব মানুষদের কথা ভাবা উচিত সরকারের। যে দেশে কৃষকদের আত্মহত্যা লেগে থাকে, যে দেশের বহু অঞ্চলে অর্ধাহার, অনাহারে থাকতে হয় মানুষকে, পানীয় জলের অভাবে হাহাকার ওঠে, সে দেশের কি এখনই ‘নগদহীন’ আর ‘ডিজিটাল’ হওয়া মানায়?

বিজ্ঞাপন

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here