Search

আমাদের কথাগুলো বলার জন্য কে কে থাকলেন আর

আমাদের কথাগুলো বলার জন্য কে কে থাকলেন আর

prasenjitপ্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

এই সংক্ষিপ্ত স্মরণ-বার্তা লেখার সময় অবধি নাসিরুদ্দিন শাহের বিবৃতি জানতে পারিনি। হয়তো তা জানার জন্য নয়। হয়তো তা নিয়ে ভাবতেও নেই। নাসিরের আত্মজীবনী ‘দেন ওয়ান ডে’-র ছত্রে ছত্রে রয়েছে তাঁর ও ওম পুরীর বন্ধুত্বের কথা। প্রমাণ দিতে নেই সব বন্ধুত্বের, তবু নাসির দিয়েছেন। বইতে প্রচুর ছবি রয়েছে তাঁদের দুজনের।

ওম পুরীর দ্বিতীয় বিয়ে ভেঙেছে (প্রথম বিয়ে মাত্র ৮ মাস টিকেছিল) ২০১৩ সালে। সাংবাদিক স্ত্রী নন্দিতা পুরী ২০০৯ সালে ওমের জীবনী লিখেছিলেন, ‘আনলাইকলি হিরো: ওম পুরী’। সেখানে ওমের প্রচুর নারীসঙ্গের কথা ফলাও করে বলা ছিল। খুব রেগে গিয়েছিলেন ওম।

আর আমরা, যারা সামান্য সিনেমা-জ্ঞান হওয়ার পর থেকে জেনে গেছিলাম হিন্দিতে ‘আর্ট ফিল্ম’ বলে একটা ব্যাপার আছে, যেখানে বিনোদনের জন্য রুপোলি পর্দার জায়গায় একটা আয়না টাঙানো থাকে, সেই আয়নায় আমরা চিনে গিয়েছিলাম নাসির ও ওম-কে। চিনে নিয়েছিলাম স্মিতা পাটিল-শাবানা আজমিকে।

om-puri-naseer-1

 

ওম পুরী যখন আশির দশকের শুরুতে ‘অর্ধসত্য’য় পুলিশ অফিসার হয়ে রাজনীতিবিদ ও সিস্টেমের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ছেন বা তারও দু’বছর আগে ‘আক্রোশ’ ছবিতে আদিবাসী কৃষকের ভূমিকায় জমিদারের অত্যাচারের মুখোমুখি, তখনও আমরা বড়ো হইনি। আমরা তখনও বড়ো হইনি যখন সত্যজিতের সদগতির ‘দুখি’ ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে। যখন সে সব দেখলাম, তখন মনমোহন সিং-এর উদার অর্থনীতির জমানা এসে গেছে। কয়েক বছর বাদেই হয়ে যাবে লক্ষ্মণপুর বাথের গণ-দলিত-হত্যা।

গোবিন্দ নিহালনির টিভি সিরিয়াল তমস কিংবা গৌতম ঘোষের ছবি ‘পার’-এর কথা উল্লেখ থাক। উল্লেখ থাক উৎপলেন্দুর ‘চোখ’ ছবির কথাও। কিন্তু যেটা না বললেই নয়, সত্তর দশকের শুরুতে মারাঠি ছবি ‘ঘাসিরাম কোতোয়াল’-এ ঘাসিরামের চরিত্রে অভিনয় করে যাঁর অভিনয়জীবন শুরু, তিনি ১৯৯৬ সালে এসে গুলজারের ‘মাচিস’ ছবিতে হয়ে গেলেন শিখ জঙ্গি নেতা। আয়নার রং বদলে বদলে বারবার আমাদের এমন এক ‘ক্লিশে’-র সামনে দাঁড় করিয়েছেন ওম, যার কথা, কে জানে, হয়তো ব্যাকডেটেড-ই শুনতে লাগে আজকাল। শ্রেণির লড়াই, আমজনতার বেঁচে থাকার নিষ্ঠুর সংগ্রাম ও প্রতিশোধের কথার মতো সত্যগুলো তো ফিনিক্স পাখির গল্পের মতোই ‘ক্লিশে’।

om-puri-in-jaane-bhi-do-yaron

কত বড়ো অভিনেতা ছিলেন ওম পুরী। ‘জানে ভি দো ইয়ারোঁ’-র মতো আরও আরও কত কত ছবিতে তাঁর অসাধারণ কমিক টাইমিং বা অন্যান্য প্রতিভার নজির মিলেছে। হলিউড ও অন্যান্য কোন কোন দেশি-বিদেশি ছবিতে অভিনয় করে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, সে সব কথা এখানে নাই বা চর্চা করলাম।

om-puri-madhuri

 

কারণ, এই তো সে দিন উগ্র দেশপ্রেমের বাজারে দগ্ধ ও ক্ষুব্ধ হতে হতে আমরা শুনে ফেলেছি, ওম পুরী বলছেন – সেনারা তো চাকরি করতেই যায় আর্মিতে। তাদের তো কেউ বাধ্য করে না। আমাদের অনেকের ঠিক মনে হয়েছিল এই কথাগুলো। যা শুনতে ভালো লাগেনি বিজেপি সাংসদ অনুপম খেরের। তিনি বলেছিলেন, ওম সাহেবের কথা দুর্ভাগ্যজনক। সেই অনুপমের করা টুইট থেকেই সারা দেশ শুক্রবার জেনে ফেলল ‘ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা অভিনেতা’ মারা গিয়েছেন।

আর আমরা আরও একটু নিঃসঙ্গ হলাম। কে কে রইলেন আর, যাঁদের চরিত্রায়িত ‘জীবনের টুকরো’গুলো দেখতে দেখতে বুকে বিশ্বাস জমা হবে অক্সিজেনের মতন। মনে হবে, আমি অভিনয় করতে পারি না তো কী হয়েছে, ওম তো আছেন।

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন