‘উন্নয়ন’ বোঝাতে তৈরি হয় মূর্তি, লেগে থাকে কৃষকদের আত্মহত্যা

0
29

wrivuশ্রয়ণ সেন

২১০ মিটার উচ্চতার শিবাজিমূর্তি, খরচ হবে ৩৬০০ কোটি টাকা। মহারাষ্ট্রের দাবি এটাই নাকি হতে চলেছে বিশ্বের সর্বোচ্চ মূর্তি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে হৈহৈ করে তার ভূমিপুজোও হয়ে গেল শনিবার মুম্বইয়ে। কিন্তু যে দেশে কুড়ি শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বাস করেন, সে দেশে শুধুমাত্র একটি মূর্তি তৈরি করা কি আদৌ প্রাসঙ্গিক?

দারিদ্রের প্রসঙ্গে না হয় পরে আসা হল, কিন্তু পরিবেশ নষ্ট করে এই মূর্তি তৈরি কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল? মুম্বই উপকূলে আরব সাগরের বুকে একটি ছোট্টো দ্বীপে এই মূর্তি তৈরি করা হবে। মূল মুম্বই ভূখণ্ডের সঙ্গে এই দ্বীপের সঙ্গে সংযোগ করার জন্য মেট্রো লাইনও তৈরি করা হবে। সেই মেট্রো লাইন যে সমুদ্রের ওপর দিয়ে যাবে সেটা বলাই বাহুল্য। মেট্রোর ব্রিজের জন্য লম্বা লম্বা খাম্বা হবে এবং সেগুলো সমুদ্রের বুক চিরেই তৈরি হবে। সুতরাং বলাই যায় যে আগামী বেশ কয়েক বছর সামুদ্রিক পরিবেশ ধ্বংস করে ‘উন্নয়ন’-এর বিরাট যজ্ঞ হতে চলেছে। এখানেই আপত্তি তুলেছেন পরিবেশবিদরা। জলজ প্রাণীদের যে জীবন বিপন্ন হবে সে ব্যাপারে একমত তাঁরা।

বিজ্ঞাপণ

জলজপ্রাণীদের জীবন বিপন্ন হলে শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই নয়, মার খাবেন মৎস্যজীবীরাও। কারণটা বোঝা খুব সহজ। মাছ মরলে মৎস্যজীবীরা ব্যবসা করবেন কী ভাবে! এই কথা মাথায় রেখেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন মৎস্যজীবীদের সংগঠন, যদিও সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেও পরে তাঁরা বাতিল করেন। পরিবেশ ধ্বংস করার অভিযোগ অবশ্য এটাই নতুন নয়। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে দিল্লির যমুনার পাড়ে ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক উৎসব’ আয়োজন করে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া তো হয়নি, জরিমানা দিয়েই পার পেয়ে যান তিনি। উল্লেখ্য, সেই উৎসবও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

modiravi    

আরও পড়ুন: শ্রী শ্রী-র উৎসবে ধ্বংস হয়েছে যমুনা তীরের জীববৈচিত্র্য, বলছে রিপোর্ট

তবে পরিবেশ ধ্বংস করে শিবাজিমূর্তি তৈরি করার পরিকল্পনা কিন্তু বিজেপির নয়, মহারাষ্ট্রের পূর্বতন কংগ্রেস-এনসিপি জোট সরকারের। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে শুধু এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু যে প্রধানমন্ত্রী সব সময় গরিবের কথা বলেন, নোট বাতিল ইস্যুতে বিভিন্ন সভায় বারবার গরিবদের প্রসঙ্গই টেনে এনেছেন, তাঁর সরকারের কি এই প্রকল্পে এত টাকা অপচয় করার কোনো দরকার ছিল, আবার এমন একটা রাজ্যে যেখানে কৃষক আত্মহত্যা লেগেই রয়েছে?

রাজ্যসভায় পেশ হওয়া একটি রিপোর্টে দেখা গেছে ২০১৫-তে মহারাষ্ট্রে দিনে ৯ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। আবার এই বছর প্রথম চার মাসে অন্তত ৫০০ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে খবর। কৃষক আত্মহত্যা বিভিন্ন কারণেই হয়ে থাকে, যার মধ্যে অন্যতম কৃষকদের ঋণ নিয়ে শোধ করতে না পারা। পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে ফি-বছর মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ আর মরাঠাওয়াড় অঞ্চলে চাষ মার খায়, এর ফলেও কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।

এখানেই কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল রাজ্যের। যে টাকা দিয়ে এই মূর্তি বানানো হচ্ছে, কৃষিঋণ মেটানোর জন্য কি সেই অর্থ সাহায্য করা যেত না কৃষকদের। বরাবর বিজেপির সমর্থক বলে পরিচিত চেতন ভগত নিজের টুইটারে লিখেছেন, “৩৬০০ কোটি টাকা নিয়ে শিবাজির মূর্তি না বানিয়ে মহারাষ্ট্রের বুক চিরে একটা শিবাজি খাল তৈরি করা যেতে পারত। এর ফলে উপকৃত হতেন কৃষকরা। কমত আত্মহত্যা।”

কিন্তু এটা ভারতবর্ষ। এখানে দেশের উন্নয়ন বোঝানোর জন্য বুলেট ট্রেনের স্বপ্ন বেচতে হয়, বেশি ভাড়ার গতিমান এক্সপ্রেস চালাতে হয়, বিশাল মূর্তি তৈরি করতে হয়। কিন্তু আর পাঁচ জন সাধারণ ভারতবাসীর অবস্থা তেমনই থেকে যায়।

বিজ্ঞাপন

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here